12 April, 2008

বউ, বাটা, বলসাবান এর আয়নায় দেখা নজমুল আলবাব

নজমুল আলবাবের লেখা ছোটগল্প পড়ার সুযোগ পেয়েছি বিভিন্নভাবে; ব্লগ, রাইটার্স ফোরাম এবং এক সময় বন্ধুসভার পাতায়। অল্প কথায় গল্প বলার কৌশলে তার লেখা পাঠকের মনে জায়গা করে নেয়, সে স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন প্রায় বছর দশেক আগে। তবে এবার গল্প সংকলন 'বউ, বাটা, বলসাবান' পড়তে গিয়ে আলবাবের গল্প গাঁথা এবং বলনশৈলী জানার সুযোগ হয়েছে এক মলাটে তেরোটি গল্পে।

নজমুল আলবাবের গল্প শরীর বিস্তারে বপু নয়। অন্ততঃ ছয়টি গল্প বেশ পরমাণু সদৃশ। বাকীগুলো তুলনামূলকভাবে বড়ো, তবে নির্ঝঞ্ঝাট ও বাহুল্য বর্জিত। নাম ভূমিকার 'বঊ বাটা বলসাবান' শব্দ সংখ্যায় তিনশ'রও নিচে, অথচ প্রথম পাঠেই মুগ্ধ করে। আরোপিত সামাজিক সংলাপ কিংবা ধারাভাষ্য নেই, সাবলীলভাবে বলে যাওয়া কথা- 'বল সাবান কিংবা বাটার জুতা বদলানো অসম্ভব, কিন্তু বঊ বদলানো কোনো ব্যাপারই না'। ঠিক পরের গল্পটি, 'বিভিন্ন মিতভাষণ'ও কাছাকাছি পর্যায়ের - দর্শক হয়ে বলে যাওয়া, খুব কাছে থেকে দেখা মানুষ - তাদের আচরণ নিয়ে টুকটাক করে বলে যাওয়া। লেখকের ভাষায় - 'যখন যে ঘটনা ঘটেছে চোখের সামনে অথবা মনে, তখনই মাথায় জন্ম নেয়া শব্দ আর বাক্যগুলো অবিকল বেরিয়ে গেছে কলমের ডগা দিয়ে'।

গল্পের প্লটের জন্য লেখক নিজের চারপাশকেই বেছে নিয়েছেন, এজন্যই আমরা দেখি তার বেশিরভাগ গল্প উত্তম পুরুষে বলা - হয়তো আলবাব এভাবেই সাবলীল বোধ করেন, আর গল্পগুলো মূলতঃ সংসারের চৌকাঠে এবং এর মানুষগুলো ধারণ করে। 'কাল ঘুম নেমে আসে তার চোখে' এবং 'বুকের ঊপর সাপের রাস্তা...' এ দুটি গল্পের কথক পরিপূর্ণ সংসারী মানুষ, তবে নানান জটিলতা ঘিরে রাখে চারপাশ এবং এ জটিলতার সমাধান চরিত্রটি দিতে পারে না। তাই আমরা দেখি জহির শুক্রবার বিকেলে ঘর থেকে বের হয়ে যায় - রুপা একা কান্না লুকায়, কিংবা সুমনার স্বামী হতভম্ব হয়ে রাত জাগে। এখানে মূল চরিত্রের ব্যর্থতা - না পারার কষ্ট, পাঠকের সমুদয় সমর্থন আদায় করে নেয় গল্প শেষ হওয়ার আগেই। এসব সীমাবদ্ধতা আরো স্পষ্ট হয় - 'আমার কোনোদিন দুধ চা খাওয়া হবে না' গল্পে, মোকাম্মেল নামের মানুষটি তার মধ্যবিত্ত সীমানা ডিঙাতে পারে না। চারপাশের চতুর মানুষদের কাছে সে বারবার হেরে যায়; মুহিভাইয়ের বাক্স বয়ে নেয়া, আপন সংসারে গুরুত্বহীন হয়ে থাকা, এবং শেষে বাণিজ্যে দৌড়ে ছোটোভাইয়ের কাছে হেরে মোকাম্মেল পাঠকের কাছে সকরুণ প্রশ্ন রেখে যায় এই বলে যে - আমার বৌও ক্ষেপেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, যে লোক বৌয়ের রিকশাভাড়া দিতে পারে না তার আবার এত লম্বা কথা কেন? এ প্রশ্নের ঊত্তর পাঠকেরও জানা নেই, কারণ মোকাম্মেল সৎ , নীতিবান - নির্লোভ মানুষ। চাতূর্য্যের জীবনে ঠেলে দেয়া নয় বরং নির্মোহ থাকার সুস্পষ্ট ইংগিত গল্পে পূর্ণতা দেয়।

এ পাঁচটি গল্পের তুলনায় 'সে রাতে পূর্ণিমার সাথে আমি তোমাকেও দেখেছি' নিতান্তই ভালোবাসার গল্প, প্রেমের গল্প। এখানেও আলবাব সংসারী মানুষের কথা বলেন, মুমুর সাথে অদ্ভুত পূর্ণিমা দেখা শেষে হাসপাতালে অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় পায়চারি। অথচ প্রবল ইচ্ছা সত্বেও মুমুর গাল ছোঁয়া হয় না, বলা হয় না পাশে থাকার কথা। কারণ, চেনা-অচেনা কতোজন তখন মুমুকে ঘিরে ধরে। সে-ই সামাজিক বেস্টনী, চৌকাঠ ভালোলাগা। অন্যদিকে 'ব্যক্তিগত ব্যাখ্যান' গল্পে দেখি - শৈশব-কৈশোর স্মৃতির দুমদাম হানা। শোলক বলা কাজলাদিদির মতো বেলা'দি-বড় আপুকে খুঁজে ফিরে অপু, কল্পনায় আসে সবুজ প্রকৃতি, রঙীন পেন্সিল আর আকাশী জামা কিংবা উজ্জ্বল আকাশের স্বপ্ন। এ বাসনা নিশ্চিতভাবে হারানো সময়কে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্খা, এবং দ্রোহের আগুনে বর্তমান পোড়ানোর খেদ।

তবে 'দেয়ালে দাগ', 'হাবিব আলীর পতাকা পূরাণ', 'আমাদের ক, খ, গ, ঘ, এবং ঙ' গল্প তিনটিকে আলাদা করে রাখা যায় বিষয় বৈচিত্র্য এবং ভিন্নতার জন্য। 'হাবিব আলীর পতাকা পূরাণ' গল্পের হাবিব আলী বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ঊছিলায় ওড়ায় পেয়ারে পাকিস্তানের পতাকা, এবং শেষে আমরা দেখি - হাবিব আলী অপার্থিব এক ভালোলাগায় নতজানু হয় চাঁদতারা খচিত পতাকার সামনে। কী ভয়ংকর এক বাস্তবতা, নিপুঁণ লেখনীতে উঠে আসে পাঠকের সামনে। গল্পটি সম্ভবতঃ ১৯৯৯ সালে লেখা, তবে আশ্চর্যজনকভাবে গল্পের সত্যতা আমরা দেখেছি চার/আট বছর পরে বিশ্বকাপ ক্রিকেট মৌসুমে - হয়তো দেখবো দু'হাজার এগারো সালেও, হাবিব আলীদের বংশ বিস্তার ও সাম্প্রতিক প্রবণতা সে ইংগিতই দেয়! অন্য গল্প 'আমাদের ক, খ, গ, ঘ, এবং ঙ' রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের প্লট তবে সেটা অনেকদিন পরে পারিবারিক সংকট উত্তরণে বর্ণিত - আব্বা দাদাজানের কথা শুনেছিলেন। আমাদের সময় এখন সবসময় সূর্যরাঙা, আমরা ভালো আছি, ভালো থাকি...। এখানেও দেশের রাজনৈতিক কৌশলের ছাপ পাঠক পায় পরোক্ষভাবে। তবে আচমকা থেমে চমক দিয়েছে 'দেয়ালের দাগ'। বন্ধুর খোঁজে গিয়ে হতভম্ব হওয়া রনজুর প্রতিক্রিয়া পাঠক না জানলেও দেয়ালের ওপাশে ছাপান্নটি দাগ দেয়া মানুষটির কষ্ট পাঠককে স্পর্শ করে। গল্পটি আরো বড়ো হতে পারতো - 'চিলেকোঠার সেপাই'য়ের ওসমান যেমন বন্ধু কবিরকে খুঁজে পায়নি, তেমনি রনজু কাহিনীও আরো বিস্তৃতি পেতে পারতো - হতে পারতো একটি বড়সড় গল্প।

নজমুল আলবাব বড় গল্পের স্বাদ মিটিয়েছেন 'এই মেঘ, রাত ও রৌদ্র'তে। কবি ময়নুল মোশাররফ গৎবাঁধা যাপিত দিনে শাহানার ফ্ল্যাটে হাজির হয়। ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছিলাম - এক বৃষ্টিময় দুপুরে অপু গিয়েছিলো শাহানার ফ্ল্যাটে - 'বৃষ্টি পিয়াসি আমি আর শাহানা' গল্পে। দুটো গল্পেই দ্বিধাময় মনে নায়ক ফিরে আসে। তবে পাঠকের সাথে শাহানার পরিচয় হয় আরো আগে 'আপন ভূমিকা' গল্পে, যেখানে- ইউরোপ প্রবাসী স্বামী পায় শাহানা, ...আর কারো হুতাশ হয় - সব শালারাই বুঝি রুচি বদল করার জন্য বারবার ফিরে আসে। এই 'আপন ভূমিকা'কে প্রথম পর্ব ধরলে একটি চলমান স্রোত আমরা দেখি পরের দু'গল্পে বয়ে গেছে। শাহানা ফিরে আসে লন্ডন থেকে, দেয়ালে তার মেয়ের ছবি - অপু কিংবা ময়নুল শাহানার ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়, অথচ কাছে যেতে পারে না। অপু তাকিয়ে থাকে শাহানার সে-ই আশ্চর্য সুন্দর তিলটার দিকে আর ময়নুল ভুলে কবিতার খাতা রেখে আসে শাহানার বাসায়। তিনটি গল্পে শাহানাকে পাই বলে নয়, শাহানার বদলে যদি মোনা কিংবা রুপাও নাম হতো - পাঠক ঠিকই যোগসুত্র টেনে নিতো, আর বলতো - শাহানা আখ্যান আরো লম্বা হোক উপন্যাসের পাতায়। নজমুল আলবাব কি বিষয়টি নিয়ে ভাববেন?

এই তো গেলো আলবাবের গল্পের মানুষদের গল্প।
কিন্তু তিনি গল্প বলেন কীভাবে? আলবাবের ভাষায় জটিলতা নেই, ভীষণ সাবলীল বর্ণনা, তবে - কৌশলে আলবাব খুব নির্মম। চোখ বুলিয়ে বাকল স্পর্শের উপায় নেই, বরং পুরো মনোযোগ নিয়ে গল্পের নির্যাস দেয়ায় লেখক উদার। আলবাব গল্প শুরু করেন কিছু বিক্ষিপ্ত কথা বলে, মনে হতে পারে অপ্রয়োজনীয় তথ্য, মনে হতে পারে নামগুলো মনে রাখার দরকার নেই। অথচ খেই হারালে আবার মন দিতে হয় প্রথম থেকে। 'আপন ভূমিকা' আর 'কালঘুম নেমে আসে তার চোখে' গল্পদুটি এ কৌশলের সেরা উদাহরণ। প্রথমদিকের সৃষ্ট জটিলতা খুলতে থাকে পরের বাক্যে বর্ণনে এবং শেষ লাইন পর্যন্ত চলে এ খেলা। আগে যেমন বলেছি - 'দেয়ালের দাগ' গল্প আচমকা থামিয়ে আলবাব পাঠককে চমকে দিয়েছেন। এর বাইরে হুট করে চমকানোর বা ধাক্কা দেয়ার চেষ্টা আর কোনো গল্পে আমরা দেখি না। 'বিভিন্ন মিতভাষণ' উত্তম পুরুষে বলা - বাগানের নির্জনে পেয়ারা গাছ পাওয়া, আশফাক ভাইয়ার গেমস তৈরি কিংবা সিপ্রাদি'র পায়েশ রান্না শেষে, গল্পের একেবারের শেষ বাক্যের আগের বাক্যে আমরা জানতে পারি - কথক একজন মেয়ে! প্রথম তিন প্যারায় কোনো ইংগিত না থাকায়, এবং লেখক পুরুষ বলে পাঠকের কাঠামোবদ্ধ মন ভেবে নেয় - এ পুরুষের গল্প। শেষে চমকানোর সুযোগ থাকলেও তা নগন্য হয়ে যায় অন্য কারণে - 'সন্তানের মন নাকি মায়েরা বোঝেন সবচে' সহজে'। এই শেষ লাইনের বিশ্লেষণে আগের প্রতিটি চরিত্র-ঘটনা বোঝা পাঠকের জন্য আবশ্যিক হয়ে ওঠে; এ কৌশলটির কথা বলছিলাম একটু আগেই।

লেখক আলবাব মূল কাহিনীর একজন হয়েও কাহিনীতে অংশ নেন না, বরং দর্শক হিসেবে খুটিনাটি জেনে পাঠকের কাছে যেনো চুপিসারে আসেন গল্পের ভান্ডার নিয়ে যেখানে জীবন্ত থাকে - আব্বা-আম্মা-দাদাজান-বড়ভাই- আমাদের সংসার ও চারপাশ। আলবাব গল্প লিখেন ছোট ছোট বাক্যে। তাড়াহুড়ো থাকে না। চোখে খটকা লাগলেও আসোলে/বল্ল/নরোম এর মতো ভিন্ন বানান তিনি নিজের করে নিয়েছেন।

শেষে যেটা না বললেই নয় - নজমুল আলবাবের গল্পগুলোয় 'আমরা'র প্রাধান্য ব্যাপক। সে কারণেই যৌথ জীবন যাপনের সংশয় সংকট সত্ত্বেও চরিত্রগুলো আমাদের আপন হয়ে উঠে, সাথে গল্পগুলোও।
_

আগ্রহী পাঠকের জন্য নজমুল আলবাবের ৩টি গল্পের লিংক:
- বউ, বাটা, বলসাবান
- বিভিন্ন মিতভাষণ
- বৃষ্টি পিয়াসি আমি আর শাহানা


-

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP