25 March, 2008

গল্প: নীলুফার যখন মারা গেলো

তাদের দেখা গিয়েছিলো এক সাথে, কেউ বলে শনিবারে আবার কেউ বলে শুক্রবারে। তবে বৃহস্পতিবারে সন্ধ্যায় লতু মোল্যার দোকানে তারা টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে চা খেয়েছিলো এমনটা গ্রামের অনেকেই দেখেছে - বলাবলি করছে এবং এ বিষয়ে কারো বিন্দু-বিসর্গ সন্দেহ নেই - তাদের দেখা গিয়েছিলো শুক্রবার জুম্মার নামাজে প্রথম কাতারে, হয়তো বিকালে কমলতলা বাজারেও তারা ছিলো। এখনো এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি যে তারা এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেছে অথবা কোথাও যাবে যাবে করছে। তারা, মানে আমাদের সতেরো নম্বর কমলতলা ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন মেম্বার আবদুল কালাম এবং তার ডানহাত ছুট্টোমিয়া, এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেলে এবং কিছুদিন পরে ফেরত এলে গ্রামের কারো কিছু বলার থাকবে না, করার থাকবে না। বিভিন্ন সময়ে কালাম মেম্বর এবং ছুট্টোমিয়া একসাথে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো, সাথে যোগ দিয়েছিলো তুলশীপাড়া গ্রামের সুজিত সাহা, যথারীতি পরে ফিরেও এসেছে - সেটা গ্রামবাসীর কাছে নতুন কিছু নয়। তবে এবার নীলুফার আক্তার মারা যাওয়ার পর এলাকার লোকজনের মনে হয় কালাম মেম্বর এবং ছুট্টোমিয়া আবার এলাকা ছাড়া হবে। সাথে তুলশীপাড়ার সুজিত সাহাও হারিয়ে যাবে কিনা এবং গেলে কতোদিন পরে তারা ফিরে আসবে এ বিষয়ে কেউ কেউ কানাঘুষা করে।

দুই.
তবে এই কানাঘুষাটা তেমন ঘন হয় না নীলুফারের মৃত্যূ শোকে। রেল লাইনের ডান পাশে ডিস্ট্রিক্ট রোডের ঢালু খালি জমিতে ছনের ছাউনি আর বাঁশের বেড়ার ঘরঅলা যে বাড়ী, সেটা নীলুফারদের বাড়ী। নীলুফারের মৃত্যূতে এলাকার লোক শোকাহত হয়, তবে শোক জানানোর আসরটা নীলুফারদের বাড়ীতে বসে না। মানুষের মুখে মুখে নীলুফারের মৃত্যুর খবর কমলতলা বাজার, লতু মোল্যার দোকান, প্রাইমারী স্কুলের মাঠ কিংবা ডিস্ট্রিক্ট রোডের শেষ মাথায় নতুন গজিয়ে ওঠা মোবাইল ফোনের দোকানে ছড়িয়ে যায়। এইসব শোকগুজার স্থানের কোথাও আমরা নীলুফারের বাবা, গরীব চাষী সালামাতুল্লাকে দেখি না। সালামাতুল্লা কী করছে, কী খাচ্ছে, মেয়ের শোকে কেমন ভেঙে পড়েছে সে খবরও কেউ নেয় না। গ্রামের লোকজন নীলুফারের জন্য মন খারাপ করে, কারণ নীলুফার গরীব সালামাতুল্লার মেয়ে, নীলুফারের এখনো মরার বয়স হয়নি, কিংবা একই গ্রামের একটা মানুষ আচমকা মারা গেলো - এই সব ভেবে ভেবে লোকজন মন খারাপ করে । তবে এই মন খারাপে নীলুফারের বর্ননা কিংবা নীলুফারের সাথে কোনো স্মৃতিময় ঘটনা উঠে আসে না। কারণ, নীলুফারকে তারা কেউ দেখেনি। তাদের অনেকেই নীলুফারের নাম জেনেছে তার মৃত্যুর সংবাদের পরে, কিংবা জানাযারও পরে। যেসব ছেলেমেয়ে প্রাইমারী স্কুলে দল বেঁধে খালি পায়ে যায় কিংবা লতু মোল্যার দোকানে দশ টাকার কেরোসিন কিনতে শিশি হাতে আসে তাদের অনেককেই গ্রামবাসী চিনে আবুল হোসেন - সামসুদ্দিন - আলাউদ্দিন কিংবা তারামিয়ার ছেলেমেয়ে নামে। এদের মাঝে কখনো নীলুফার ছিলো না। কেউ কেউ ভাবে - নীলুফার হয়তো পর্দানশীল ছিলো, হয়তো লাজুক ছিলো, হয়তো পরপুরুষকে দেখা দিতো না সে - তাই এলাকার চা দোকান কিংবা বাজারে আনাগোণা করা মানুষরা নীলুফারকে দেখেনি কখনো। মনে মনে - অনেকে এটাও মেনে নেয় যে - গরীব সালামাতুল্লার বাড়ীতে যাওয়ার প্রয়োজন কখনো হয়নি, তাই তার মেয়ে নীলুফারকে দেখাও হয়নি। ডিস্ট্রিক্ট রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে কারও কখনো পিপাসা লাগেনি যে গরীব সালামাতুল্লাহর বাড়ীতে গিয়ে এক মগ পানি চাইবে অথবা পিপাসা লেগেছিল কিন্তু গরীব এবং নোংরা বলে কেউ পানির আশায় সালামাতুল্লার বাড়ীমুখো হয়নি। কেউ কেউ ভাবে - কখনো পানি চাইতে গেলে হয়তো নীলুফার পানি এগিয়ে দিতো, নীলুফারের ফরসা কিংবা কালো - মোটা অথবা চিকন হাত দেখা যেতো। বাড়ীর বৌ-ঝিদের কেউ কেউ নীলুফারকে দেখেছিল, তার লম্বা চুল ছিলো, পায়ে আলতা ছিলো, হাতে চুড়ি ছিলো, কপালে হয়তো টিপও ছিলো এবং তাকে দেখা গিয়েছিলো কালাম মেম্বরের বাড়ীর বাইরে আর্সেনিকমুক্ত পানির কলতলায়। আলাউদ্দিনের বৌ মুখে পান চিবিয়ে তারামিয়ার বৌয়ের মাথায় সুগন্ধি নারিকেল তেল মাখতে মাখতে নীলুফারের যে বর্ননা দেয় তাতে নীলুফারের এক রকম কল্পনা মনে আসে, কিন্তু এ বর্ণনা গ্রামের বাকী দশ বিশটা মেয়ের সাথে মিলে যায় এবং নীলুফার ক্রমশ: সাবিনা - সুলিমা - মর্জিনাদের একজন হয়ে যায়, আসল নীলুফারকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং তুলশীপাড়ার কল্পা মাসী এ খবর দেয় যে - গত তিন বছর নীলুফারের চেহারা গ্রামের কেউ দেখেনি, কারণ নিলুফার মাদ্রাসায় পড়তো, সেখানেই থাকতো এবং বছরে ছ'মাসে বাড়ী আসলেও বোরখা পড়ে চলতো, কল্পা মাসীর বাড়ীর সামনে দিয়ে হেঁটে যেতো। একদিন পথ চলতে 'তুমি কোন বাড়ীর মেয়ে গো' জিজ্ঞেস করে কল্পা মাসী নীলুফারের পথ থামিয়েছিলো, নীলুফারও থেমে খানিকটা জিরিয়ে নিয়েছিলো এবং বলেছিলো সে - কমলতলার সালামাতুল্লার সেজো মেয়ে নীলুফার। বোরখার ফাঁক গলিয়ে কল্পা মাসী সে'দিন নীলুফারের চোখ দেখেছিলো, নাকের দুপাশে ফর্সা মুখও দেখেছিল - মনে হয়েছিল নীলুফারের বয়স পনেরো অথবা ষোলো। এভাবেই অনেকে প্রথম জানলো - নীলুফার সালামাতুল্লার একমাত্র মেয়ে নয়, আরও মেয়ে আছে - এই ভেবে কারো কারো শোক হয়তো খানিকটা কমে আসে এবং লতু মোল্যার দোকানে এক কাপ গরম চায়ে ঠোঁট চুবায়। কেউ হয়তো আস্তে করে বলে - মেম্বর সা'ব তো এখনো গেরামে আছে।

তিন.
কমলতলা ইউনিয়ন গোরস্তানে নীলুফারকে মাটি দিয়ে বৃদ্ধ সালামাতুল্লা ঘরে ফেরে, সে হয়তো দাওয়ায় বসে থাকে - আকাশে তাকায়, হয়তো মগে ঢেলে পানি খায়। ছোটো মেয়ে শরীফা হয়তো একপ্লেট ভাত পাশে রেখে যায়, হয়তো রেখে যায় না; কারণ চুলায় আগুন জ্বলেনি। সালামাতুল্লাহ কন্যা শোকে পাথর হয়ে যায়, তবে ঠিক তার পরদিন লোকজন দেখে হাতে ঝুড়ি আর কাঁস্তে নিয়ে সে জমিতে নিড়ানি দিতে চলেছে - নিজের জমি নয়, হতে পারে আবুল হোসেন, আলাউদ্দিন কিংবা সামসুদ্দিনের বর্গা ক্ষেত। কেউ কেউ অনুমান করে নীলুফারের মৃত্যুতে সালামাতুল্লাহ খুব অখুশী হয়নি, কারণ পাঁচটা মেয়ের বিয়ে দেয়া নিয়ে সে প্রায়ই দু:শ্চিন্তায় থাকতো, আজকাল ডিমান্ড ছাড়া পাত্র আসে না - এতোসব কষ্টের কথা খাঁ খাঁ রোদের দুপুরে ঝিল গাছের তলায় বসে বিড়িতে ফুঁক দিয়ে সালামাতুল্লাহ বলেছিলো - পাশের মোস্তফা কিংবা সাইফুল্ল্যাকে। মোস্তফা কিংবা সাইফুল্ল্যা জানতো সালামাতুল্লার পাঁচ মেয়ে, এর মাঝে কতো জনের বিয়ে হয়েছে সেটা জানতো না, জানার আগ্রহ হয়নি অথবা সালামাতুল্লার বাড়ীতে কখনো ডেকোরেশন কোম্পানীর লাইট জ্বলেনি বলে বিয়ের খবর তারা কেউ জানেনি। এমনকি সালামাতুল্লার সেজো মেয়ের নাম নীলুফার এটা মোস্তফা-সাইফুল্ল্যারাও জানতো না। অথচ সালামাতুল্লাহ মনে মনে নীলুফারকে নিয়ে গর্ব করতো। সাত বছর বয়সে মা মরে যাওয়ার পর নীলুফার কান্না করেছিলো খুব, বড় বোন আকলিমা পাঁচ দিনের মিলাদের পর স্বামীর বাড়ী চলে গিয়েছিল। মেজ বোন শিরিনা সারাদিন সাংসারিক কাজ করতো আর নীলুফার ব্যস্ত থাকতো ছোটো শরীফা এবং লতিফাকে নিয়ে। লতিফা মারা গিয়েছিলো দশ মাস বয়সে, মায়ের মৃত্যুর চারমাস পরে, জ্বরে - ঠান্ডায় এবং হয়তো ক্ষুধায়। বছর তিনেক আগে কমলতলা ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের পাশে 'কমলতলা এতিমখানা ও মহিলা মাদ্রাসা' চালু হলে সালামাতুল্লা খবর নিয়ে, ছুট্টোমিয়ার সুপারিশে, নীলুফারকে মহিলা মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল এবং পড়ালেখায় ভালো হওয়ায় সে তিরিশটা এতিম মেয়ের আবাসিক হোস্টেলে মুফতে থাকা খাওয়ার সুবিধাও পেয়েছিলো। নীলুফার এতিমখানায় যাওয়ার পর কিছুদিন সালামাতুল্লার ঘরটা খালি খালি মনে হয়েছিলো, মনে হয়েছিলো - বাড়ীর সামনের বড় খেজুর গাছটা কেটে ফেললে যে রকম শুন্য লাগে একপাশ, সেরকম খালি হয়ে গেছে সালামাতুল্লার ঘর। তবে এই ভেবে ভালো লেগেছিলো - অন্যান্য উনত্রিশ এতিম সাথী এবং তিনবেলার খানা খেয়ে এতিমখানায় নীলুফার অবশ্যই ভালো আছে। এতিমখানায় টিনের ঘরে সারাদিন কিতাবে নামাজে ইবাদতে আদবে নীলুফার গুণবতী পরহেজগার হয়ে উঠবে, ভালো ঘরে বিয়ে হবে, সুখে থাকবে - এমনটা ভেবে ভেবে সালামাতুল্লাহ কোনও সকালে-দুপুরে অথবা বিকালে এবং হয়তো রাতেও মুখ লুকিয়ে সুখের হাসি হেসেছিলো। ভালো লেগেছিলো যখন গত কার্তিকে নীলুফার ছুটিতে বাড়ী এসেছিল - সারা শরীর ঢাকা পবিত্রাকন্যা। দুইদিনে নীলুফার ঘরদোর সাফ করে তকতকে করে রেখেছিলো। রোজ সকালে আজানের আগে উঠে যখন নামাজ কলেমা এবং সুর করে নিঁচু স্বরে অজিফা পড়তো তখন সালামাতুল্লার মনটা অন্য রকম রোশনাইতে ভরে যেতো। মনে হতো এই সকালে দলে দলে ফেরেশতা গরীব সালামাতুল্লার ভাঙ্গা বাড়ীর চারপাশ ঘিরে রেখেছে, রহমত আর বরকতের ফিনফিনে বাতাসে ভরে যাচ্ছে ঘর। এ বাতাসে এবার ভালো ফলন হবে, গাইটা বেশি দুধ দিবে এবং সামনের শীতে ঠান্ডা কাশির ভাবটা কমে যাবে। সালামাতুল্লার ইচ্ছা করতো মেয়ে নীলুফারের জন্য কিছু ভালোমন্দ বাজার করবে, শিরিনা রান্না করে নীলুফারের পাতে খানিকটা বেশি ঝোল দিবে - সালামাতুল্লা বলবে - 'তোদের মা'য়ের রান্নাও এরকম ছিলো'। এসব ইচ্ছা পূরণ হয়েছিলো কিনা তা আমরা জানি না, কারণ - নীলুফার বাড়ী এসে কি খেয়েছিলো তা আমাদের কানে আসেনি, সালামাতুল্লাও এরকম সাংসারিক সুখের গল্প কারও সাথে করেনি। তবে নীলুফারকে মাটি দেয়ার পরদিন অথবা তারও পরদিন সালামাতুল্লাহ যখন দুপুরে না খেয়ে জমিতে কাজ করে তখন ঝিল গাছের তলায় বসে সাইফুল্ল্যাহ বিড়ি হাতে আস্তে করে আঙুল তুলে মোস্তফাকে বলে - দেখ, ছুট্টোমিঞা না? মোস্তফা এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে সেদিকে তাকায় আর বিড়বিড় করে বলে - এরকম চক্কর দিতাছে ক্যা?

চার.
তখনও কালাম মেম্বর এবং ছুট্টোমিঞা গ্রাম ছাড়া হয়নি। তারা কমলতলা বাজারে পেপার পড়ে, চা খায় - সুজিত সাহার আড়তে কথা বলে। কেউ কেউ চাল-ডাল-তেল কেনার ভান করে সুজিতে আড়তের কিনারে ঘুরঘুর করলেও বুঝতে পারে না কালাম মেম্বরেরা কী নিয়ে কথা বলে। কখনও তারা রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, কখনও মাছের বাজার পাঁকা করার কথা বলে, চাল-ডাল-তেলের আগুন দামের আলাপ করে, হয়তো মরে যাওয়া নীলুফারকে নিয়েও দু'চারবার মন খারাপ করে। অনেক রাতে তারা কমলতলা প্রাইমারী স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে এক সাথে ঘরে ফিরে - এমনটাও লতু মোল্যার দোকানে বসে কেউ কেউ দেখে। এই দেখায়ও মানুষের মনে সন্দেহ দূর হয় না, তারা লতু মোল্যার দোকানে - ডিস্ট্রিক্ট রোডের শেষে ফোনের দোকানে এমন কি কমলতলা বাজারেও মানুষ ভাবে - এরা উধাও হয়ে যাবে, এদের দেখা যাবে না কয়েকদিন। মানুষের এ সন্দেহ অমূলক নয় সেটা সবাই জানে। কারণ, অনেক সংকট মুহুর্তে গ্রামে কালাম মেম্বর এবং ছুট্টো মিঞাকে পাওয়া যায় না। শোনা যায় - তারা সে সময় স্থানীয় সরকারের জেলা অফিসে গিয়েছিলো এলাকার বরাদ্দ আনতে, কাগজপত্রের জটিলতায় ফিরতে দেরী হয় দুইদিন তিনদিন করে পাঁচদিন। এই ফাঁকে কারা যেনো কমলতলা ছাত্র পরিষদের পলাশকে খুন করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে। লাশ ঝুলে একরাত এক বেলা - খবর পেয়ে পুলিশ আসে তবে কাউকে ধরে না। তুলশীপাড়ার সুজিত সাহা এসে পুলিশের সাথে কথা বলে - বোতাম খোলা শার্ট পরে পলাশের বাবা অথবা বড় ভাইকে কান্নায় জড়িয়ে ধরে। এরকম অনেকেই কাঁদে। এবং পাঁচদিন পরে এলাকায় কালাম মেম্বর - ছুট্টো মিঞা ফিরে আসে। আসরের নামাজ শেষে দু'জন পলাশের কবরের সামনে মোনাজাত ধরে। পেছন পেছন এলাকার আরও কয়েকজন বৃদ্ধ, রুগ্ন কিছু কিশোর শামিল হয়। উপড়ানো মাটির সবুজ ঘাসগুলো ততদিনে মলিন হয়ে গেছে, মানুষের শোকও কমেছে। শোক পেরিয়ে পরদিন কালাম মেম্বর গ্রামের রাস্তা বাঁধাইয়ের ঘোষণা দেয়, ট্রাকে করে ইট আসে, খুন্তি-শাবলের ঠুক ঠুক শব্দে গ্রামের লোক উন্নয়ন দেখে, এবং আস্তে আস্তে পলাশকে ভুলে যায়। তবে পলাশ খুনের সময় কালাম মেম্বর-ছুট্টো মিঞার এলাকায় না থাকার কথা মানুষ ভুলে না। তারা মনে রাখে, কারণ - আরও আগে যেবার গ্রামের নিতাই শীলের ঘর দখল করলো সামসুদ্দিনের ভাতিজারা সেবার নিতাই শীল দৌড়ে গিয়েছিলো কালাম মেম্বরের বাড়ীতে, কালাম মেম্বর বাড়ী ছিলো না, ইউনিয়ন পরিষদের অফিসেও ছিলো না, ছুট্টো মিঞাও ছিলো না। পরে জানা গেছে - তুলশীপাড়ার সুজিত সাহাও ছিলো না এলাকায়। নিতাই দুই রাত তিন দিন কালাম মেম্বরের পুকুর ঘাটে ঝিম মেরে বসে ছিল, হয়তো কেউ দয়া করে কিছু খেতে দিয়েছিল, হয়তো দেয়নি। তবে তিনদিন পরে সকালে পুকুরে নিতাইয়ের লাশ ভেসে উঠেছিলো। কেউ কেউ বলে - না খেয়ে দূর্বল হয়ে ঘুমের ঘোরে পুকুরে ডুবে মারা গেছে, কেউ বলে পুকুরের অদেখা শক্তিটা টেনে ডুবিয়েছে, কেউ আবার বলে - তার মৃগী রোগ ছিল। পঁচা লাশ দেখতে গ্রামে পুলিশ এসেছিলো কিনা সেটা কারও মনে পড়ে না। তবে কালাম মেম্বর - ছুট্টো মিঞা এবং সুজিত সাহা গ্রামে ফিরেছিলো বারো দিন পরে। সাথে ছিলো তুলশীপাড়ার নগেন যোগীর অন্ধ ছেলে, অন্ধ নয় - ভালো চোখ নিয়ে ফিরেছিল। কমলতলা ইউনিয়নের লোকজন জানে - নগেন যোগীর অন্ধ ছেলেটাকে চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়ার শংকর নেত্রালয়ে নিয়েছিল সুজিত, খরচ দিয়েছে কালাম মেম্বর এবং সঙ্গী ছুট্টো মিঞা। অন্ধ ছেলের জগত দর্শনে মানুষের মাঝে শোরগোল পড়ে যায়। কমলতলা পেরিয়ে তুলশীপাড়ায় লক্ষীপূজার ঢোল একটু জোরেই বাজে। সে উৎসবে ঈশ্বর হয়ে যায় - কালাম মেম্বর। মাঝ রাতে উৎসবের মাঝে এলাকার লোক দেখে কালাম মেম্বর - ছুট্টো মিঞা এবং সুজিত সাহা মসজিদের পুকুর ঘাটে কী কী আলাপ করে। কেউ কেউ মনে করে - তারা হয়তো নিতাই শীলের জন্য মন খারাপ করে, আবার হয়তো সামসুদ্দিনের ভাতিজাদের নতুন বাড়ী দাওয়াত নিয়েও কথা বলে। এবং এভাবেই কমলতলার অনেকে নিতাই শীলের কথা ভুলে যায়, তার বৌ-ছেলে এলাকা ছেড়ে কোথায় গেলো সে প্রশ্ন আর মনে পড়ে না। তবে এই কথা সবার মনে পড়ে - অনেক অকল্যাণময় ঘটনার সাথে এই তিনজনের এলাকা ছাড়ার মিল পাওয়া যায়। এবং গ্রামবাসী এটাও খেয়াল করে যে, খারাপ ঘটনার সময় কিংবা তারও পরে তারা গ্রামে থাকে না এবং শেষে ফিরে আসে কোনও এক সুসংবাদ নিয়ে। সেদিন লতু মোল্যার দোকানে তারামিয়া কোন এক বেখেয়ালে এরকম ঘটনা আঙুলে গোণে - তালিকায় অনেক আগে তুলশীপাড়ার মন্দির ভাঙ্গা, সুবিদালীর মেয়ে স্কুল থেকে না ফেরা, আলাউদ্দিনের পুকুরের মাছ চুরি, বার্ষিক নাটকের রাতে নবতরুণ ক্লাব ঘরে আগুন লাগা উঠে আসে। পাশ থেকে রং মিস্ত্রি জেবালাম্মদ মনে করিয়ে দেয় - নুরুল হুদার বৌ উত্তরদীঘির বশিরের সাথে ভেগে যাওয়া এবং তৈয়বালীর বিদেশ যাওয়ার আগেরদিন পাসপোর্ট হারানোর ঘটনা। এইসব ঘটনা অথবা সমস্যা সমাধানে এলাকার মাথা হিসাবে সবার প্রথমে কালাম মেম্বরের কথা মনে পড়ে, মনে হয় - একমাত্র কালাম মেম্বরই এসব সমস্যার মিটমাট করতে পারবে। অথচ এলাকাবাসী বিষ্ময় নিয়ে বারবার দেখে এসব ঘটনার সময় অথবা পরে কালাম মেম্বর বাড়ী নাই। ছুট্টো মিঞাও নাই, মাঝে মাঝে সুজিত সাহাও নাই। ঘটনা দূর্ঘটনার হিসাব ডান হাতের কড়ে রেখে তারামিয়া এবং জেবালাম্মদ অন্য হাতের আঙুলে আনন্দের সংবাদগুলোর হিসাব রাখে - এলাকায় ইলেক্ট্রিসিটি, সবার জন্য ৩ কেজি গম, স্কুল ভবনে রং করা, অথবা মসজিদে দু'দফায় কার্পেট, ফ্যান আর মাইকের আচমকা আগমন - এইসব লেনদেন গোণা শেষ হলে তারামিয়া এবং জেবালাম্মদ একে অন্যের দিকে তাকায়, চোখে কিছু ইশারাও হয়তো দেয়, তারা কী বলে সেটা কেবল তারাই বুঝে, লতু মোল্যা বুঝে না - হয়তো বুঝে, কিন্তু না বুঝার ভান করে - এবং শেষে দোকানের সামনে টুং-টাং ঘন্টা বাজিয়ে চলে যাওয়া কটকটিঅলার দিকে তাকায়।

পাঁচ.
এরকম অনেক কিছু অনেকেই ভাবে, এবং খোঁজ খবর নিয়ে নিশ্চিত হয় - নীলুফার গত তিন বছর 'কমলতলা এতিমখানা ও মহিলা মাদ্রাসা'র হোস্টেলে ছিলো। সরকারের এমপি এবং দলের দক্ষিণ জেলা সাধারণ সম্পাদকের সরাসরি তদারকী থাকায় অনুমান করা যায় - নীলুফার তিন বেলা খাবার পেয়েছে, বৃষ্টি বাদলায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। তাহলে নীলুফার মারা গেলো কেনো? এবার এ প্রশ্নে এলাকার কেউ কেউ কপাল কুঁচকায়। নীলুফারের কী কঠিন কোনো অসুখ ছিল, সেটা গোপন ছিলো বলে টের পায়নি এবং আচমকা মারা গেলো এই শুক্রবার রাতে? মরার আগে নীলুফার কী বলেছিলো, সে কি কাউকে দেখতে চেয়েছিলো অথবা কিছু খেতে চেয়েছিলো? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব আমরা, কমলতলা ইউনিয়নের লোকেরা, জানি না। তবে লতু মোল্যার দোকানে সামসুদ্দিনের ভাতিজা খবর দেয় - নীলুফার রাতে ঘুমের ঘোরে মারা গেছে, তার হাত দুটো সোজা করা ছিলো, চোখ দুটো বোঁজা ছিলো, মুখে হাসি ছিলো। এতিমখানার সুপারভাইজর, কালাম মেম্বরের স্বামীহীন বড় বোন, মোছাম্মাত জয়নাব বেগম এ কথা জানায় যে - নীলুফার আগের রাতে এশারের নামাজ পড়ে, ভাত খেয়ে নিয়মমতো বিছানায় গিয়েছে, রাতে কোনো শব্দ করেনি, এবং আরেক ছাত্রী আছিয়া সকালে নীলুফারকে নামাজের জন্য ডাকতে গেলে দেখে নীলুফারের শরীর বরফ শীতল হয়ে আছে। ক্রমশ: ডাকাডাকি-ধাক্কায় নীলুফারের মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হয় কমলতলায়, গরীব কৃষক সালামাতুল্লার বাড়ীতে, তুলশীপাড়া থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিক্ট রোডের ফোনের দোকান পর্যন্ত।

সেই থেকে আমরা নীলুফারের মৃত্যুর সাথে কালাম মেম্বর - ছুট্টোমিঞা এবং সুজিত সাহার সংযোগ খুঁজি। এতিম খানায় তাদের যোগাযোগ কেমন ছিলো, তারা কখনো নীলুফারের সাথে বাতচিতে গিয়েছিলো কিনা, নীলুফারের অন্য সখীদের সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করি। এখানে আমরা কিছু গোপন ফিসফিসানি শুনি - কালাম মেম্বর মাঝ রাতে এতিমখানায় যেতো - তবে সত্যতা জানতে জয়নাব বেগমকে আমরা জেরা করতে পারি না। কেউ কেউ সালামাতুল্লাহকে ডেকে জিজ্ঞেস করে গত তিন মাসে তার সাথে কারো দ্বন্দ্ব হয়েছে কিনা। এরকম জীবন্ত একটা মেয়ে রহস্যজনকভাবে মরে যাওয়ার পরে কোনো পুলিশ এলো না সেটা নিয়ে আমরা কথা বলি। লতু মোল্যার দোকানে এসব আলাপ থামায় আলাউদ্দিন, বলে - গরীবের মেয়ে মারা গেলে কোর্ট কাঁচারি খরচ চালাবে কে? এরপর আমরা নিশ্চিত হই - খুন কিংবা হত্যা নয়, এখানে দৃশ্যমান কোনো শত্রু নেই, অতএব - নীলুফার অজানা কোনো অসুখে মারা গেছে।

এসব সিদ্ধান্তে পৌঁছেও আমরা, কমলতলার লোকেরা, কালাম মেম্বর-ছুট্টোমিঞা এবং সুজিত সাহার উপর নিয়মিত চোখ রাখি। কিন্তু এবার তারা এলাকা ছাড়া হয় না - তাদের দেখা যায় কমলতলা বাজারে সুজিত সাহার আড়তে, প্রাইমারী স্কুলের মাঠে আর পরের জুম্মার জমায়াতের প্রথম সারিতে। তবুও আমরা অপেক্ষা করি - কখন তারা এলাকা ছাড়া হবে এবং নতুন একটি সুসংবাদ নিয়ে ফিরে এসে আমাদের মুখে হাসি এনে দিবে।
.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP