24 March, 2008

ধূলিমাখা চাঁদের ডাক...

তাকে ডেকেছিলো ধূলিমাখা চাঁদ,/মধ্য দুপুর;/বুকের মাঝে হিম সন্ধ্যার/নিথর পুকুর। সেজুঁতির জন্য এ কবিতা লিখেছিলো দীপু। কথা ছিলো - পহেলা বৈশাখে কবিতা ব্লক করা শাড়ী পরে সেজুঁতি ক্যাম্পাসে আসবে। কথা ছিলো - 'উচ্ছ্বাস' নামের সংগঠনের ব্যানারে উৎসবে মাতবে একদল তরুণ প্রাণ।

এ আয়োজনের পরিকল্পনায় মিটিং ডাকে - আপাত: রাজনীতির বাইরে সিনিয়র-জুনিয়র কিছু ছেলেমেয়ে, এদের কেউ বিতার্কিক, কেউ গায়ক, গীটার বাদক, নীরব কবি এবং সবাই নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। উৎসব আয়োজনে অভিজ্ঞ, সম্প্রতি রাজনীতি ছেড়ে দেয়া, আনিস আসে মিটিংয়ে - উপন্যাসের শুরু এখানে। ক্যাম্পাসে আনিসের প্রবেশ থেকে মিটিং রুমে আসার বিবরণ বেশ দীর্ঘ। ক্যাম্পাসে আনিস হাঁটে, ক্যান্টিন পার হয় - আনিসের মাথার ভেতর বয়ে চলা তড়িৎ চিন্তার সাথে পাঠক জানে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক হালচাল, কোন্দল আর গুটিচাল। বিক্ষিপ্ত এসব বিবরণে একটু ক্লান্তি আসে, তবে ততক্ষণে পাঠক হয়ে উঠে উচ্ছ্বাস'এর একজন।

এরপর মনে হয় - উপন্যাসের মূল চরিত্র আনিস নয়, দীপু। দীপুর মা মারা গেছে, ভাই বোন নেই, বাবা নিরুদ্দেশ। চাচা-চাচীর সংসারে অনাকাঙ্খিত জীবন, টিউশনি করে চলা এবং উচ্ছ্বাসের জন্য মন-প্রাণ নিবেদনে দীপু পাঠকের আপন হয়ে ওঠে দ্রুত। অথচ কোনো কিছুই দীপু ঠিকমতো করতে পারে না, অস্থিরতায় কিছু ভুলচুক থেকেই যায় এবং নীরবে কান্না ঢাকে। এখানে কাহিনী ক্রমশ: দীপুকে ঘিরে চলতে পারতো, তা না করে আমরা দেখি - আবার আনিসের প্রাধান্য। কারিশমায় আনিস ছাড়িয়ে যায় দীপুকে; গল্পের সুপারম্যান নয়, বরং ঠান্ডা মাথার দূর্দান্ত যৌক্তিক এক মানুষ আনিস - শান্ত অথচ ব্যস্ত হিরো। আনিসের দর্শন আর ভাবনা আসে ঘটনা পরম্পরায়। নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা আর তাৎক্ষনিক বুদ্ধিমত্তার মিশেলে পরপর দু'বার কলেজ প্রিন্সিপাল থেকে উৎসবের অনুমতি আদায় করে নেয় আনিস। অথচ তার চারপাশে তখন পথ আঁটকায় প্রশাসনিক বেড়াজাল, রাজনৈতিক ক্যাকটাস, যেখানে প্রিন্সিপাল-বদরুল-ফয়েজ-তৌহিদ একই রকম। জটিল রাজনৈতিক হিসাবের গরমিল খাতে পড়ে উচ্ছ্বাস উৎসব।

এরপরও আমরা দেখি - বর্ষবরণের আয়োজন চলে। কাহিনী ডালপালা ছড়ায় লতার মতো - প্রিয় ক্যাম্পাসে, নিজস্ব পরিসরে ধীরলয়ে - অহেতূক ঘটনা বৃদ্ধিতে যায়নি। কেবল মোরশেদ চরিত্রটিকে মনে হয়েছে লেখক বড্ডো অযতনে ভুলে গেছেন কিংবা বেশি যতনে শোপিচ করে রেখেছেন। ভারতে পড়ালেখা করা মোরশেদ অ্যাকাডেমিক মানুষ, গ্রাফিক্স ভালো বুঝে, নিজে লিটিলম্যাগ বের করে, সাহায্যপরায়ণ লোক - যে দীপুর সাথে মজা করে চা খায়, কবিতা নিয়ে জ্ঞান দেয় - অথচ উপন্যাসের মূল স্রোতের বাইরে থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। মোরশেদ কি তবে জনবিচ্ছিন্ন তাত্ত্বিক গুরুদের ছায়া চরিত্র!

দিনের ক্যাম্পাসে উচ্ছ্বাস কর্মীদের ছোটাছুটি, দীপু-সেজুঁতির খানিক কাছে আসা আর মাঝরাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে সৃষ্টির আনন্দে কাজ করে কিছু চিত্রশিল্পী - শাহআলম, আপেল, সেতু, দীপুসহ অন্যরা। সে রাতে হুমকির আচঁড় কাটতে চায় তওহীদ - ধর্মের নষ্ট ব্যবহারে বিষন্ন হয় মান্না, কষ্ট পায় দীপু এবং পাঠক। ঘোলাটে সময়টা তখন রাতে আরেকটু স্পষ্ট হয়।

এ আঁধার আর কাটে না। বুক পকেটে ধুলিমাখা চাঁদের কবিতা ডাক নিয়ে সেজুঁতির খোঁজে ক্যাম্পাসে যাওয়া দীপু সেজুঁতিকে পায় না, বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে ফয়েজদের সাথে। পড়ন্ত বিকেল, সন্ধ্যা শেষে রাত আসে, দীপু ঘরে ফিরতে চায় অথচ ফিরতে পারে না। পরদিন চারপাশে নীরবতা আর ঘনিয়ে আসা একরাশ অন্ধকারে একাকী দাড়িয়ে থাকে আনিস।

উপন্যাসের পরিশিষ্টে জানা যায় - সিলেট এমসি কলেজের সত্য ঘটনা অবলম্বনে এ কাহিনী লেখা। বোধ করি - সে জন্যই লেখক পুরো আখ্যানে সময়কে নয়, ঘটনাকে ধরতে চেয়েছেন। এবং গতিময় গদ্যে একটি ছিমছাপ উপন্যাস পাঠককে উপহার দিয়েছেন।

টুকটাক কিছু বানান বিভ্রাট দ্রুত গতির এ গল্পে এড়ানো যায় সহজেই, তবে একই মলাটে উপন্যাসের নামে ডেকেছিল/ডেকেছিলো - ধূলিমাখা/ধুলিমাখা একটু চোখে লাগে।

এক সময়কার রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মানুষ, সৌখিন (!) সাংবাদিক, জনপ্রিয় ব্লগার আরিফ জেবতিক তাঁর নিজস্ব ধাঁচে আগামীতে আরও বড় আখ্যান নিয়ে হাজির হবেন আমাদের সামনে এমনটিই আশা করছি। তবে "তাকে ডেকেছিল ধূলিমাখা চাঁদ" পড়ার পরে পাঠকের প্রত্যাশাটি দাবী হয়ে যায়!

.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP