15 March, 2008

বকেয়া পোস্ট - শেষ : এই নীল নির্বাসন

ঢাকা ফিরতে দেরী হয়ে যায়। কারণ, অনেকগুলো সামাজিক দেখা সাক্ষাতে যেতে হয় এবং গিয়ে লক্ষ্য করি - এক মধ্য প্রজন্মে আমি দাঁড়িয়ে। চাচা-চাচী, খালা-খালু যারা এতদিন আমার প্রিয় মানুষ, আমি যাদের অতি স্নেহের; মনে হলো তাঁরা সবাই শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কথায় আচরণে নানা রকম শারীরিক অসুস্থতা প্রাধান্য পায়। বিপরীতে নতুন এক প্রজন্ম আমাকে মামা কাকা ডেকে কাঁধে চড়তে চায়। বুঝতে পারি, এখন চকলেটের লোভ আমার নয়, বরং পকেট ভর্তি চকলেট রাখতে হবে নতুন কথা শেখা এ শিশুগুলোর জন্য।

চট্রগ্রাম থেকে বিদায় নেয়া শুরু করি। প্রিয় মানুষগুলো দরজায় দাঁড়িয়ে বিদায় দেয়। গেইটটুকু পেরুতে আমি চারবার পেছনে তাকাই। বুকটা ভার হয়ে আসে। একইভাবে ক্যান্সারাক্রান্ত খালু বিকেলে আমাকে ফিরতে দেয় না। ধমকে বসিয়ে রাখে রাতের খাবারের জন্য। আমিও ঘড়ি দেখি, রাত বেড়ে যাচ্ছে, আরেকটু বসি বসি করে বের হতে হয়। পাকা রাস্তা পর্যন্ত টর্চ জ্বালিয়ে খালু আসেন আমার সাথে। রিক্সার জন্য অনেক অপেক্ষা করে তাদেরও ছেড়ে আসি। অন্ধকার রাস্তায় পেছনে কিছু দেখা যায় না। আকাশে অগণন তারা। চোখ দুটো কচকচ করে ওঠে। আলবাব ভাইকে ফোন করে কথা বলি ভিন্ন প্রসঙ্গে।

-

ঢাকা ফিরে আমার হাতে সময় আড়াই দিন। অনেকগুলো কাজ জমে আছে। অনেকের সাথে এখনও দেখা বাকী। সবার আগে দরকার প্লেনের টিকিট রি-কনফার্ম করা। কারওয়ানবাজার ঘুরে শেষে উত্তরা যাই প্লেনের টিকিট আনতে। শুনি - টিকিট আনতে লোক গেছে মতিঝিলে, পথে ভীষণ জ্যাম। দেরী হবে। দেরী হয়। পত্রিকা রিপোর্ট করেছে - বিশ্বের নোংরা শহরের তালিকায় ২য় স্থানে ঢাকা। আমার বিশ্বাস হয় না। কোটি মানুষের এ ভীড়, রাস্তায় দলবেঁধে হেটে যাওয়া শ্রমিকদল। বুকে শিশু আগলে রাখা ভিখারীনি মা'য়ের এ শহর নোংরায় ২য় হতে পারে না, কোনোভাবেই না।
দুপুরে বাসায় খাবো। জ্যামে বসে থাকি। দেখি বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড। আকাশ ঢেকে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনে।

শহরের তরুণ-তরুণীগুলো মন খারাপ নিয়ে বসে থাকে। ওয়েটিং ফর গডো? আকাশ ঝেপে ডিজুস বৃষ্টি নামে। এসএমএস বৃষ্টি। এ বসন্তে ডিজুস বৃষ্টিতে ভেজাবেই ভেজাবো - মাত্র দশ টাকায় পাঁচশ এসএমএস। ইয়েস লিখে থ্রি জিরো থ্রি জিরো নম্বরে পাঠাও। উনত্রিশ পয়সা আর পঁচাত্তর পয়সা মিনিটের নানা প্রলোভন। টিভির পর্দা ছাড়িয়ে এ বিজ্ঞাপন লেপ্টে যায় বিআরটিসির বাসে। লাল শর্ট কামিজ আর নীল জিন্সের তরুণীরা বিজ্ঞাপন থেকে বেরিয়ে আসে। রাজলক্ষী মার্কেট, মাস্কট প্লাজা, কিংবা চলতি পথে এমন সাজসজ্জার উঠতি কিশোরী তরুণী চোখে পড়ে। জিন্স এখন তুমুল ট্রেন্ড। কলারঅলা কামিজ, থ্রি কোয়ার্টার হাতা, গুছানো ওড়না কিংবা শাড়ীতে বেগম রোকেয়া রমণীরা কোথায় হারালো! বিউটি পার্লারের তোড়ে এখন আন্টি-আপু বোঝা দায়। ছেলেগুলো কানের কাছে ইয়ার-প্লাগ। হয়তো এফএম। হাবিব ফ্যাশনের কথা আগের পর্বে বলেছিলাম। আপাদমস্তক হাবিব হয়ে হাঁটছে অনেকে। কে জানে হয়তো রেস্তঁরায় গিয়ে জিজ্ঞেস করছে - "ভাই শাধা ভাত আর মাছ হবে?" এবি ব্যাংকের বিজ্ঞাপন। এক সময় মামা-চাচা কিংবা বাবা-মার হাত ধরে সন্তানেরা মিডিয়ায় সিঁড়ি বাইতো। এখন ছেলের বদৌলতে বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদও নতুন জীবন পেয়েছেন। বাবা ছেলের বিজ্ঞাপন, অ্যালবাম। কোথায় সেই গান - 'ডেগের ভিতরে ডাইলে চাইলে উতরাইলে গো সই, সেই উতরানি মোরে উতরাইলি'। এফএম চ্যানেলেও এসব গান নেই। বালামের এক মুঠো রোদ্দুর এখন তুমুল জনপ্রিয়। মিরপুরে-উত্তরায় হাঁটতে গিয়ে খেয়াল করেছি দোকানগুলোয় এফএম রেডিও বাজছে সজোরে। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতে আগে রাস্তার পাশের দোকান থেকে ভেসে আসা সাড়ে সাতটায় সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান দূর্বার কিংবা জনসংখ্যা পরিকল্পনা কার্যক্রম - এসো গড়ি সুখের ঘর আর শোনা যায় না। পড়ন্ত বিকেলে চা'য়ের দোকানে আব্দুল জব্বারের 'তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়', রাস্তায় রিক্সার টুং টাং শব্দ বিলীন। আরজে'দের খলবলানিতে অনেক স্মৃতিময় ভালোলাগা হারিয়ে যাচ্ছে।

যানজট এড়াতে মহাখালী ফার্মগেট এড়িয়ে টঙ্গী - আশুলিয়া বেড়ী বাঁধ ধরে বাসায় ফিরি। লম্বা পথ, রাস্তা ভালো না তেমন, এরপরও ভালো লাগে - ফাঁকা রাস্তা। দুপাশে আবাসিক প্রকল্প গজাচ্ছে। খানিক গরমেও চলতি পথের বাতাস ভালো লাগে। আরেকটু আগাতেই চোখে পড়ে প্রেমিক জুটি। কেউ কেউ স্কুল-কলেজ ইউনিফরমে; কমার্স কলেজ - হলিক্রস - ভিএনসি চেনা যায় সহজে। রাসনা মিনি রেস্টুরেন্ট - খোলা জমির ওপর ভাসমান কেবিন, এক পাশ কাপড়ে ঢাকা। শহরে ডেটিং স্পটের বড়ো সংকট। আচমকা চোখ আঁটকে যায় - মূল রাস্তা থেকে নেমে যাওয়া খানিক নিচে - গোলাপী স্কিন টাইট টি-শার্ট ফুঁড়ে ওঠা বক্ষ, গুটানো প্যান্ট - কালো চশমায় ফটো সেশনে ব্যস্ত সোমত্ত তরুণী, পাশে ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত তিন চার জন। খানিক দূরে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে দশ বারো জনের খালি গায়ের উশকো চুলের কিশোর। রাস্তায় দাঁড় করানো ফিয়াট কিংবা পাজেরো কিংবা অন্য কিছু , যার দরজা থেকে এক সুঠাম তরুণ নেমে নিচে যাচ্ছে। ঘাঁড় ফিরিরে আর দেখা গেলো না। রিক্সা আসতেই আমার চোখ চলে যায় সেদিকে। ছোটো হয়ে আসছে পৃথিবী, ছোটো হয়ে আসছে রিক্সা, প্রেমিক-প্রেমিকারা আরও কাছাকাছি বসতে আরও ছোটো হয়ে আসুক। চুমুগুলো আরও নিরাপদ হোক।
ধ্যুত, আমি বোধ হয় প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাচ্ছি কিংবা হিংসুটে।

-

মান্নার মৃত্যু তখনও টক অব দ্য টাউন। সনি-জোনাকী-আনন্দ সিনেমা হলে মান্নার ছবি; অবুঝ শিশু - শ্রেষ্ঠ সন্তান। দেয়ালে দেয়ালে বিজ্ঞাপন। শোক - আত্মার শান্তি কামনা। টিভি চ্যানেলে বিশেষ স্মরণ তখনও। জানাজার দিন এফডিসিতে পুলিশের বেধড়ক পিটুনি খাওয়া এক ভক্ত আরটিভি-তে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে - 'আসছিলাম এক নজর দেখার জন্য, মান্না ভাই যেমন ডায়লক, তেমন পাইটিং, ড্যান্স - উনার মতো আর বিকল্প নাই'। শোকাহত এ ভক্তের মুখে হাসি। মনে হয় - টিভিতে দেখা যাবে এ আনন্দে হাসি আঁটকানো দায়।

-

অনেক কৌশলে সময় বের করে শেষ মুহুর্তে আজিজে ঢুঁ মেরেছিলাম মুক্তান্বেষা আর সচলয়াতন সংকলনের জন্য। দোকান বন্ধ ছিল।

-

গুলশান-১এ চাংপাই হাউজিং প্রকল্পের পাশে টিনের ঘেরা দেওয়া, ছোটো দরজা। বোঝা যায় না ভেতরে কী। খোলা আকাশের নিচে গোল টেবিলে কিছু আলোকিত মানুষ স্বপরিবারে সাপার কিংবা ডিনার করছে। টেবিলে মেনু সাঁটা। দুপাশে তিনটি দোকান। আমি সাথের বন্ধুকে অনুসরণ করে কোণার কাঁচ ঘেরা দোকানে যাই।
পান-সুপারী।
পানের দোকান। এয়ারকন্ডিশনড। রবীন্দ্রসংগীত বাজছে সাউন্ড সিস্টেমে। ক্যাশে বসা শহুরে তরুণী। দেয়ালে ঝকঝকে কাঁচে আমার ক্লান্ত চেহারা। সামনে নানান আকারের বয়াম। ভেতরে মশলা পাতি। ঝুলন্ত লাইটে ট্রেডিশনাল পান দোকানের ছাপ। সবুজ জামা, মাথায় পাগড়ী পড়া গাল ভাঙা লোকটি মাত্রাতিরিক্ত হাত পা নেড়ে পান বানাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম - আপনি বাংলাদেশের মানুষ?
- না।
- তাহলে, কোথাকার?
- বেনারস, ইন্ডিয়া।
আমি হাসলাম, পান বানারস-আলা।
বললাম - এ কাজের জন্যই বাংলাদেশে আসছেন?
- হ্যাঁ, আমরা মোট নয় জন আছি।
- ব্রাঞ্চ কয়টা।
- তিনটা, একটা এটা, আরেকটা ধানমন্ডি, আরেকটা বসুন্ধরা মার্কেটে।
আমি আরেকটু আলাপ বাড়াই। কাদের মালিকানা জিজ্ঞেস করতেই নামটি চেনা চেনা মনে হয়। প্যাকেজ নাটকের শেষে দেখা যেতো। একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের মালিক পত্নী। আমার পান খেতে ইচ্ছে করলো না। সাথের দুজন খেলো। দাম এক যোগ এক সমান দুই। না, দুই টাকা না। দুই ডলার।
একটা পান সত্তর টাকা।
সত্তর টাকায় পান খাওয়াটা আমার কাছে বিলাসিতার বাইরেও বড়সড় অপরাধ মনে হয়, সবার জন্য না, আমার নিজের জন্য অপরাধ। কারণ, যাদের জন্য এ দোকান তারা ডলারের হিসাবে খুব বেশী মনে করবে না। আমি বরং হাকিমপুরী জর্দায় চমনবাহার মুখে দু'টাকার খিলিতেই ঝুঁকবো, যদি শখ জাগে।
সয়াবিন তেলের লিটার ছত্রিশ থেকে একশ' দশ, চাল তিরিশ থেকে আটচল্লিশ, মধ্যবিত্ত জীবন হাঁফিয়ে উঠছে ক্রমশ:, সেখানে সত্তর টাকায় পান খাওয়ার আগে আরেকবার ফিলিপ কটলারের ভোক্তা আচরণ বিধি অধ্যায়টা উল্টাবো, বোঝতে হবে - মাসলোর পিরামিডের কোথায় আমি দাঁড়িয়ে।

-

শেষের দিকের সকালগুলোয় আমার দ্রুত ঘুম ভেঙে যায়। জানালার পর্দা সরিয়ে গ্রীল দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। সকালে ঝাড়ুঅলা হাঁক দিয়ে যায় - অই ঝাড়ু-ঝাড়ু-ঝাড়ু। আমার বুকটা ধুক ধুক করে। এরকম আর মাত্র দুটো সকাল, একটি সকাল, তারপর দেশ ছাড়া। ঘন্টা কিংবা মিনিটের হিসাব। আমার হাসিগুলো থেমে যায়, টের পাই বাসার অন্যদেরও থামে। খাবার টেবিলের কথা হৈহল্লা চুপসে আসে। আমার ছোটোভাই ভাত মেখে আচমকা হাত গুটিয়ে বসে থাকে, নীরবতা ভেঙে বলে - 'ভাইয়া তুমি যাইয়ো না'। আমার মায়ের চোখের কোণায় জমা পানি লাইটের আলোয় আরও চিকচিক করে। আমি সব দেখি। বুঝি - বাবার গোপন করা দীর্ঘশ্বাস, এরকম আরও কিছু। একেবারে ঝিম মেরে থাকি। (পরে সম্প্রতি অমিত, অমিত আহমেদের পোস্টে ওর দেশ ছাড়ার আগের রাতের বাসার বিবরণ অনেক মিলে যায় আমার বাসার সাথে। কারণ, মানুষগুলো বাবা, মানুষগুলো মা, মানুষগুলো ভাই, মানুষগুলো বোন, মানুষগুলো আলাদা নয়; আমরা।)

-

এসব নিয়ে দ্রুত সময় কাটে।
সবাইকে ছাড়ার সময় আসে। এয়ারপোর্টে মায়ের হাত ছেড়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো আমি চারাগাছ, ক্রমাগত: শেঁকড় উপড়ে নিজেই হেঁটে চলেছি। গলায় জমাট বাঁধা কষ্ট নিয়ে দূরে সরছি। আড়াল হয় সবাই। মোবাইলের সিম গেছে পাল্টে, নম্বর হারিয়ে তাই সবার কাছে ফোন করা হয় না। দেশে নেমে দুয়েকজনকে আগ্রহ নিয়ে বলেছিলাম - দেখা করবোই করবো। তাঁদের কাছে আমি ভীষণ বিনীত হয়ে ফোন করি। কী করে বোঝাই - সময়গুলো এতো দ্রুত গেলো! মনে মনে লিস্ট করি - কাকে কাকে মেইল করে স্যরি বলতে হবে। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে একটানা ফোন করি - স্মৃতিহীন দাদী বলে, "তুমি আসবা বলে কই গেলা? কখন আসবা?"
আমি কী জবাব দিই! শুধু বলি - 'কিছুদিন পর আবার আসবো।'
দাদু বলে - 'আল্লাহ ভরসা, ঠিক মতো আইসো'।
টিভিতে বাংলাদেশ-সাউথ আফ্রিকা ওডিআই। মাত্র বাংলাদেশ অলআউট হলো একশ আটাত্তর নাকি সাতাত্তর।
খালেদ মাহমুদ সুজন - চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফতের বিশ্লেষণ শেষে সংগীতানুষ্ঠান; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান। আপেল মাহমুদ গাইছে - 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি'। প্লেনে ওঠার ডাক পড়ে। টিভিতে তখন - 'আমরা তোমাদের ভুলবো না।'

মধ্য দুপুরে রানওয়েতে এতো রোদ ছিলো কিনা জানি না। নাকি আমার ভারী চোখে সব কড়া লাগছিলো! অসহ্য সব কিছু। টিজি থ্রি টু টু; শোঁ শোঁ শব্দে উড়াল দেয়। জানালায় তাকিয়ে দেখি; আমার প্রিয় শহর, প্রিয় রাস্তা, প্রিয় ঘর; এর কোনও একটির মাঝে আমার শেঁকড়।

-

ক্রমাগত বিরক্তিকর এবং আশ্চর্যজনকভাবে আপন হয়ে আসা এ পর-শহরে আমি ফিরে আসি। মনটা ভারী থাকে। এ ভার কাটাতে ব্লগে শুরু করি বিগত দিনলিপি, বকেয়া পোস্ট। আজ এক সপ্তাহ পরে মনে হলো - কাদা মাটির মনটা একটু শক্ত হয়েছে, আরও ক'দিন গেলে পাথর হয়ে উঠবে, পাথর করে নেবো।
এবং এভাবেই এ সিরিজ পোস্টের বকেয়া শোধ হলো।
.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP