11 March, 2008

বকেয়া পোস্ট - ২ : ঢাকা টু চট্টগ্রাম

সেই বিকেলে মাথা হাল্কা লাগলে ঘর থেকে বের হতে মন চায়। দুই নম্বর স্টেডিয়ামের উল্টোদিকের এক্সপ্লোরার সাইবার ক্যাফে বন্ধ হয়ে গেছে। হেঁটে হেঁটে সোজা মীরপুর দশ নম্বর। আগে একটা সাইবার ক্যাফে ছিল নতুন মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেটাও নেই। সিরাজী সাইবার ক্যাফে বেশ বড়সড় ছিল, এবার খুঁজে পেলাম না। আবার সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার নতুন এক্সপ্লোর ক্যাফে। উদ্দেশ্য মেইল চেক করা। পাঁচ ছ'টা মেইল জমে আছে। জরুরীগুলোর জবাব দিয়ে শেষ করতেই বিদ্যুৎ চলে গেলো। ইউপিএস আছে, পাঁচ মিনিটের ব্যাক আপ। সব অ্যাকাউন্ট সাইন আউট করে বেরিয়ে আসি। সিঁড়ি অন্ধকার, মোবাইলের টিমটিমে আলোয় নিচে নামি। বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে।

চিরায়ত মিরপুর দশ। হকার বসেছে এখানে ওখানে। টুথব্রাশ - শার্ট প্যান্ট - শাল - চাদর। চশমা, মোবাইল কভার। পাশে পঁচিশ টাকার উপন্যাস; মোহাম্মদ খায়রুল বাশারের "তোমাকে ভালাবাসা আমার ভুল ছিল"।
সুইট এসএমএস গাইডও বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ পাতা উল্টে দেখে নিচ্ছে।
বামে ফুলের দোকান। রজনীগন্ধার স্টিকগুলোকে সাজানো হচ্ছে। বাসের হর্ণের শব্দে মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে আসে।
পনেরো নম্বর রুটের বাস সায়েদাবাদ-মতিঝিল-ভাষানটেক; আমার এক সময়কার নিত্যযাত্রা। এক নম্বর রুট মীরপুর-গুলিস্তান বাসের পেছনে গেইট লক সার্ভিসও চোখে পড়লো। রাস্তা পার হতে গিয়ে নামটি ভুলে গেলাম। আর মনেই পড়লো না।

রাস্তার ওপাশে ক্যাফে মীরপুর। সাতানব্বই-আটানব্বই সালে এককাপ চা'য়ের দাম চার টাকা ছিল। খুব আয়েশী হলে ঢুঁ মারতাম, সাথে হালিম অথবা মোগলাই পরোটা পনেরো টাকা। এবার যাওয়া হলো না। ক্যাফে মীরপুরের সামনে পত্রিকা স্টল। সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের ভালোবাসা সংখ্যা নতুন মোড়কে বেরিয়েছে - 'মৌচাকে ঢিল'। এক সময়কার বন্ধ হওয়া রম্য সাপ্তাহিকটি কি আবার চালু হয়েছে?
পাশে সাপ্তাহিক ক্রীড়া জগত, সাপ্তাহিক২০০০, আনন্দভূবন, মনোজগত, তারকাছবি। প্রচ্ছদে - "পূর্ণিমা ইন, শাবনুর আউট"। এখানেও এসএমএস গাইড। বইয়ের প্রচ্ছদে বাংলা ছবির নায়িকা।
এক সময়কার হাতছানি দেয়া সানন্দসম্ভার কিংবা রোগজিজ্ঞাসা চোখে পড়লো না।

চৌরঙ্গী মার্কেটের পাশে বাসায় ফেরার রিক্সা দরদাম করি। গতবারও ভাড়া ছিল ছয় টাকা, রিক্সাঅলা চাইলো দশ টাকা। ভাবলাম - দুর্মূল্যের বাজারে ভাড়া বাড়তেই পারে। আমি, পুঁজিবাদের ছাত্র, ভারসাম্য বিন্দুর প্রত্যাশায় আট টাকা বলি। রিক্সাঅলা বললো - চলেন। রিক্সায় চলতে চলতে পুরনো সব ঘ্রাণ নাকে আসে। মনে হচ্ছে, এই তো ওয়ারদা ক্লিনিক বামে রেখে ভিলা ম্যাগনোলিয়া পেরিয়ে বাদাম খেতে খেতে দোস্ত পরাগের বাসা থেকে বাসায় ফিরছি। কাল কী কী ক্লাশ আছে ভাবছি। পথে মীরপুর দু'নম্বর বাজারে বিশাল ব্যানার। "বার্ড ফ্লু'তে আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা। সঠিকভাবে রান্না করা মুরগীর মাংশ এবং সেদ্ধ করা ডিম খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। প্রচারে ঢাকা সিটি করপোরেশন"।

বাসার মোড়ের রাস্তায় রিক্সা থেকে নেমে দোকানে সাজানো সেভেনআপে চোখ যায়। দুপুরে গরুর গোশত খেয়ে স্প্রাইট খেতে ইচ্ছে করছিলো। দু'লিটার সেভেন আপ সত্তর টাকা। দেড় বছর আগেও পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা ছিলো। বোতলের উপরে কোথাও দাম লেখা নেই। পুঁজিবাদের ছাত্র, শিখছি নিত্য।

-

পরদিন সকাল সকাল বাসা থেকে বের হই। সায়েদাবাদ থেকে চট্রগ্রামগামী ইউনিক সার্ভিস। সকাল ন'টা পনেরো। বসেছি ডানের সারিতে জানালার পাশে। আমার সামনে এক তরুণ-তরুণী। স্বামী স্ত্রী কিংবা ভাই বোন কিংবা অন্য কিছুও হতে পারে। বাম পাশের সারিতে অপেক্ষাকৃত সুদর্শন তরুণ-তরুণী। এবং আমি নিশ্চিত তারা স্বামী স্ত্রী কিংবা আরও ঘনিষ্ঠ কেউ। কারণ পুরুষটি তরুণীটির কাঁধে হাত রেখে বসেছে। তরুণীটির হাত পুরুষের উরুতে। এবং মিনিট খানের পরপর তাদের দু'জনের হাতের স্থান পরিবর্তন হচ্ছে। পারষ্পরিক স্পর্শে ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ পাচ্ছে। (প্রিয় ধুসর গোধুলী, আপনি ভাববেন না - আমি চোখ ছানাবড় করে সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম। মন্দ লোকেরা বলে - এমন দৃশ্য আমি অনায়াসে নব্বই থেকে পঁচানব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। কেবল বিবরণটুকু আপনার মতো করে দিতে পারি না।)
কাঁচপুর ব্রিজ পার হতে না হতেই সামনের সীটের মহিলাটি বমি শুরু করেছে।
টাই পরা পরিপাটি সুপারভাইজর দৌড়ে এলো পলিব্যাগ নিয়ে। নিয়মিত বিরতিতে বমি চলছেই চলছে, থামে না। চান্দিনা পেরিয়েও বমি থামে না। পাশের স্বামী-অথবা ভাই-অথবা অন্য কেউ মানুষটির বিকার নেই। একবার বোধ হয় কথা বললো কিছু। তারপর চুপচাপ। হয়তো এমন বমির ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই অনায়াসে বামে দেখছে - সেই সুদর্শন তরুণীটি তরুণের কোলে মাথা রেখে সীটের উপর পা দুটি গুটিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। তরুণটি পরম মমতায় কপালে চুলে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।

মহাসড়কের পাশে বিজ্ঞাপনের বহর।
বাংলালিংক, গ্রামীণ ফোনের চোখ ধাঁধানো সাইনবোর্ড।
ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীরগুলো মলিন হয়ে এসেছে। অনেক বছর বোধ হয় রঙের প্রলেপ নেই। পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা কার্যক্রমের দুটো বিজ্ঞাপন মনে রাখার মতো - "বিয়ের পরে দু'জন মিলে সেবা কেন্দ্রে যাও/ আলাপ আলোচনা করে সঠিক পদ্ধতি নাও।"
আরেকটি "মহিলাদের জন্য টিউবেক্টোমি হলো সর্বাধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। কোনও প্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।"

চৌদ্দগ্রামে রয়েল হোস্টে বিরতির পর সামনের বমি এবং পাশের ঘুম দুটোই ভাঙে। এবং তারা ক্রমাগত সজোরে কথা বলে। জানতে পারি - বামের মানুষগুলোর গন্তব্য কক্সবাজার-রাঙামাটি। মোবাইলে লাউড স্পীকারে গান শুনছে - আসিফের গান।

ফেনী পার হলে আরেকটি বিশাল বিজ্ঞাপন : "হিরো থাকলে রিস্ক নাই। হিরো।"

এভাবে নানান মুখ-পথ-দৃশ্য পেরিয়ে আমি ছিয়াশি বছরের দাদীর পাশে আসি। স্মৃতি হারানো মানুষটি অনেক কথা শুরু করে। মনে হলো, এই চিনলো আবার চিনলো না। তবুও স্নেহের কতো প্রশ্ন, মমতার ছোঁয়া। এ শেঁকড় ছেড়ে আমি কীভাবে উঠি?

বিয়ের দাওয়াত দাঁত ফসকে গেছে। আজ রাতে বৌভাত। লোকজনের সংগী সাথী হলাম রাত আটটায়। অনেকের সাথে দেখা আট দশ বছর পরে। বরের বাবা সাবেক নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা। তাই পতেঙ্গায় তাদের কী একটা সেন্টারে খাওয়ার আয়োজন। বিভিন্ন নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে খেতে যাই। হল রূমে সাবেক প্রধানদের ছবি। বড় স্ক্রীনে বিটিভি। রাত তখন দশটা। মনে হলো অনেকেই খেয়ে চলে গেছে। আশেপাশে কেবল চেনা কিছু মুখ। খাবারে মেনুতে মুরগী নেই। বার্ড ফ্লু আতঙ্ক। তবে গরুর পাশাপাশি খাসী আছে। বরের বাবা বিশেষ কৌশলে রান্না করা ডাল টেস্ট করার বিনীত অনুরোধ করলেন। মিষ্টি এবং টক মেশানো এ ডাল নাকি নেভী স্পেশাল। আহামারী কিছু মনে হলো না। বরং শেষে বুরহানীর জগ না দেখে কিছুটা হতাশ হলাম।

চট্রগ্রাম শহরের জন্য আমার আলাদা রকম টান আছে। কোনও রাস্তা ঘাট চিনি না। তবুও ভালো লাগে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য। ঢাকার তুলনার বাগান মনে হতো। এবার আর সেরকম মনে হলো না। রাত সাড়ে এগারোটায়ও রাস্তায় ধুলো। সংস্কার নেই। বড়চাচার বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট। মোবাইলে হঠাৎ এসএমএস, গ্রামীণ ফোন পাঠিয়েছে - "রান্না করা মুরগীর মাংশ ও সেদ্ধ করা ডিম খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ।"
.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP