10 March, 2008

বকেয়া পোস্ট - ০১ : আরজে'ময় দিনগুলি

শুরুতেই মোরশেদ ভাইয়ের কথাটা রিপিট করি - "যারা দেশে বসে ব্লগিং করেন,তারা আমার অভিবাদন গ্রহন করুন।" সাইবার ক্যাফেতে জি-মেইল খুলতে ৮ মিনিট, এইচটিএমএল ভিউ। সচলায়তনের ফন্ট পড়া যায় না। ফন্ট সেটিং ঠিক করতে আরও পনেরো মিনিট। এভাবে প্রতিদিন বারবার করা হয়ে ওঠে না। তাই ক্যাফেতে কিশোর কুমারের গান শুনি, অপেক্ষা করি।
দেশ থেকে ফিরেছি রবিবার।
এই মুহুর্তে ভালো লাগছে না কিছু।
মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া গত দিন দশেকের দিনলিপি নিয়ে এসব বকেয়া পোস্ট।
____

হ্যাল্লো, ডিয়ার লিসেনার্স, গুড মর্নিং।
কুল কুল - আমি আর-জে মুকুল আপনাদের সকাল বেলার সংগী হয়ে এসেছি ,
এফ এম - - -।
_

হাই, ফ্রেন্ডজ । আমি আর জে পাঁখি আবার ফিরে এলাম। লাস্ট দু'দিন অসুস্থ ছিলাম, তাই আসতে পারিনি। আমার হাতে এখন একটি এসএমএস , পাঠিয়েছে উত্তরা থেকে সান্তনু। লিখেছে - 'ডিয়ার পাঁখি আপু, তুমি সিক শুনে আমি তোমার জন্য ১২ রকাত নফল নামাজ পড়েছি। তোমার জন্য দোয়া করেছি।'
আর-জে পাঁখি ভীষণ গদগদ । মনে হচ্ছে - এক্ষুণি কান্না শুরু করবে - "মা-ই গঅড! আমার জন্য এত্তো ভালবাসা? আমার জীবনে এরচে' বড় আর কী এচিভমেন্ট হতে পারে? উপ, উমম। ডিয়ার সান্তনু, এতদিন আমার ছোটোভাই ছিলো না বলে দু:খ ছিল। আজ আর সে দু:খ রইলো না। তোমাকে আমার ছোটোভাই করে নিলাম। তোমার জন্য এখন প্লে করছি আমার খুব পছন্দের একটি গান।"
_

ইয়েস, আবারও সময় হলো স্মৃতিকাতর হবার। এসে গেছি আমি আরজে রাজীন। আপনার প্রিয় কোনো স্মৃতি নিয়ে সংক্ষেপে এসএমএস করুন অ্যাসুনাজপসিবল। আমি ফিরছি একটু পরে। ইয়াপ, আমি জানতাম - আপনারা আমার অনেক ভালো ফ্রেন্ডস। তাই, অনেক এসএমএস জমে গেছে। আর কথা বাড়াচ্ছি না - এখন যে এসএমএসটি রিড আউট করছি তা পাঠিয়েছে শ্যামলী থেকে মুনিয়া, লিখেছে - "ভাইয়্যা, তুমি রেডিওতে যেভাবে কথা বলো, বাস্তবেও কি সেভাবেই কথা বলো?"
"হা হা, মুনিয়া। হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন? আমার মাঝে আর্টিফিশিয়াল কিছু নেই। আমি সব সময় এভাবেই কথা বলি। ভনিতা আমার একদম পছন্দ না"
_

হ্যাল্লো বোন-ধুরা, ঘড়ির কাঁটা বলছে এখন রাত দশটা পঞ্চাশ। আমি আর-জে শাকীল প্রতিদিনের মতোই হাজির। একটু আগে এসএমএস পেলাম - মুন্সিগঞ্জ হরেগংগা ডিগ্রী কলেজ থেকে শাহনুর লিখেছে - "আজ আমার মন খুব খুব খুব খারাপ। আজ আমার লাভবার্ড আমার উপর রাগ করেছে। এখন মোবাইল রিসিভ করছে না"
-

ঘড়িতে এখন রাত বারোটা।
এসে গেছেন লাভ-গুরু। সাথে অতিথি আমারদের লিসেনার্স ইশতিয়াক। আচ্ছা, আপনার মনের মানুষের সাথে আপনার প্রথম দেখা কোথায় হয়েছিল?
"কক্সবাজার থেকে ঢাকা ফিরতে"
"পথে?"
"হাঁ, বাসে?"
"ওয়াও, বাসে দেখা? কোন বাস?"
"সোহাগ পরিবহন।"
_

খবর শুনেছেন নাকি? তাহশানকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। দাড়ান, বাসায় ফোন করি।
- ভাবী, তাহশান ভাই কি বাসায় আছে?
- না তো, বাসায় নেই।
তাহলে বাচ্চু ভাইয়ের ওখানে দেখি - "বাচ্চু ভাই, আপনার ওখানে তাহশান ভাই আছেন?"
- "নাহ, আমার এখানে আসে নি।"
কোথায় গেলো? হাবিব ভাইয়ের বাসায় না তো? "হ্যালো হাবিব ভাই, তাহশান ভাই কি আপনার বাসায় আছে?"
- "তাহশান? আমার এখানে? না তো! কেনো?"
হা হা!
তাহশান ভাইকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া যাবেও না।
প্রতি শুক্রবার বিকেল তিনটা থেকে তাহশান থাকছেন আমাদের সাথে, অনলি অন রেডিও ফুর্তি - - -।
_

মোটামুটি চার পাঁচদিন কাটানোর পর ঢাকায় আমার দিনগুলো এরকম আরজে-ময় হয়ে থাকে। একটা সময় ছিল - বৈদেশ থেকে আসা বন্ধুরা দুয়েক দিনের মাঝে অসুস্থ হয়ে যেতো। সর্দি-কাশি মিশিয়ে ফ্যাশফেশে গলায় কথা বলতো, হাতে টিস্যু পেপার। সে সময় বেশ খোঁচা মেরে বলতাম - 'আহারে, ওয়েদার সুট করছে না।'
এবার আমার অবস্থা হলো সেরকম। সকালে উঠতেই গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না। শরীরের তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। দুপুরে বাড়ে আরও খানিক। ঠোঁটের উপর গোটা, লাল চোখ নিয়ে সারাদিন বাসায় থাকি। একদিন-দু'দিন-তিনদিন। নাপা দিয়ে চাপার চেষ্টা। যারা শুনলো, বললো - আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য এ অবস্থা, শহরে জ্বর হচ্ছে অনেকের। আলবাব ভাই ফোনে বললেন - 'আরে ঢাকা গেলেই অসুস্থ হয়ে যাই। ব্যাপার না।'

বাংলাদেশ বেতার (সে সময়কার রেডিও বাংলাদেশ) শোনার অভ্যাসে ফিরে এবার এফএম চ্যানেলগুলো ভরসা হয়ে ওঠে। জ্বর নিয়ে চিটাগাং যাওয়া হয় না, বিয়ের দাওয়াতটা মনে হয় দাঁত-ফসকে হয়ে গেলো। প্রতি রাতে ভাবি - সকালে ভালো লাগলেই বাস ধরবো। অথচ সকাল মানেই আবার খারাপ লাগা। তাই কুল কুল আরজে মুকুলের ভয়েস শুনি। এক সময় রাতের বেলা রেডিও'র নব ঘুরিয়ে কোলকাতার আমার১০৬-২এফএম চ্যানেল শুনতাম। কেনো জানি মনে হলো আমাদের ঢাকার আরজে'রা চলনে বলনে কোলকাতার আরজে-দের ফলো করার চেষ্টা করছে ক্রমশ:।
পুরুষ কন্ঠ মানেই একটু ভারী করা হবে। জিহ্বায় জড়িয়ে ভারী করে শব্দ উচ্চারণ করা হবে। এবং অবশ্যই অবশ্যই নি:শ্বাস ফেলতে হবে খুবই কম।
হা-ডু-ডু খেলায় যেমন নি:শ্বাস ফেললেই দান হারাবে, তেমনি আরজে'রা কথা বলার মাঝে নি:শ্বাস ফেললেই চাকরী চলে যাবে।
এক নি:শ্বাসে অনেক কথা বলে আলতো করে ঢোক গিলতে হবে। বোঝাতে হবে, আমি ক্লান্ত (তারা শব্দটিকে টায়ার্ড বলতে পছন্দ করেন)। এরপরও কৃত্রিম ভাব নিয়ে হাসতে হবে। সুইট সুইট কথা বলতে হবে। নেতাদের ভোট চাওয়ার মতো করে এসএমএস চাইতে হবে।
নারী কন্ঠের আরজে'দের তেমন ভ্যারিয়েশন নেই। মোটামুটি নাকের আশেপাশে এনে শব্দ ছুড়ে দিতে পারলেই হবে। বাংলা ইংরেজির জগাখিচুড়ির বিরক্তিকর জ্বলুনিটা আর টানলাম না।
-

শহরে নতুন নতুন ধারা আসে ফ্যাশনে।
প্যান্ট ষাটের দশকের বেলবটম পেরিয়ে বেগী কিংবা স্কিনটাইটে পৌঁছেছে এবং চক্কর খেয়েছে গত দশকে। চুলের স্টাইলে রাহুল কাট কিংবা স্পাইকিতে ভারতীয় সিনেস্টারদের ধারাকে মোড় ঘুরিয়েছে দেশি তারকারা। ফ্রেঞ্চকার্ট দাঁড়ির জায়গায় নিচের ঠোট ও থুতনির মাঝামাঝি জায়গায় একগুচ্ছ কেশের হাবিবীয় স্টাইলটি বছর দুয়েকেই পুরনো হয়ে গেলো। কুমার বিশ্বজিতের গোলাকার লেটেস্ট স্টাইলে ঝুঁকছে তরুণদল।
পোশাকী এসব সজ্জার পাশাপাশি একটি আরজে ঘরানার সমাজ আমাদের চারপাশে বোধ হয় তৈরি হতে যাচ্ছে। এদের কথাগুলো আর স্বাভাবিক মনে হবে না। মনে হবে ইথারে ভেসে আসছে অবিকল।
-

চতুর্থ দিন বিকেলে মাথাটা হাল্কা মনে হয়। আগামী সকালে ভালো লাগলেই চিটাগাং যাবো।

আগামী পর্বে: জ্বর কমেছে। বৌ-ভাত ভোজনে চট্টগ্রামগামী ইউনিক সার্ভিসের টিকিট কিনলাম।
.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP