24 February, 2008

ঘরে ফেরার গান

বিজি জিরো এইট ফাইভ। ব্যাংকক থেকে ছাড়ার কথা রাত দশটা চল্লিশে। সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টায় সুবর্ণভূমি এয়ারপোর্টে পৌঁছে আইপডে কান পাতি। বইয়ে মন বসে না। মাঝে মাঝে ঘড়ির কাটা কেমন যেন অলস হয়ে যায়। সময় কাটে না।
রাত আটটায় বোর্ডিং পাস নিয়ে জিজ্ঞেস করি - 'বিমান ডিলে হবে না?'
কাউন্টারের নাক বোঁচা মেয়েটি হাসি দিয়ে বলে - 'না, আজ ঠিক টাইমেই ছাড়বে'।
মনে হলো - ঘন্টা কয়েক ডিলে হলে ক্ষতি কী ছিল? দেশে ফেরার এ অপেক্ষাটা ভীষণ সুখকর।
এরপর ভেতরে চক্কর মারি।

নতুন এ এয়ারপোর্ট যেন মেলার মাঠ। বুকাজিনে চোখ বুলাই। বেনেজিরের আত্মজীবনী চারশ' পঁচানব্বই বাথ, প্রায় এক হাজার টাকা। পকেটে সইবে না। এরপর ই-সিক্স গেইট খুঁজি। আচমকা ডানে দেখি বিশাল এক সাদা বোর্ড। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে সবাই নিজের মতো করে লিখে যাবে। জ্যাক যোগ জুলি, আন্যা যোগ কার্ল, এরকম অসংখ্য প্রেমের স্মৃতি চিহ্ন। সুইডিশ আর চায়নিজ অথবা কোরিয়ান কিছুও লেখা আছে।
একটি লাইন ভালো লাগলো খুব - "আই লাভ ইউ, নট বিকজ ইউ আর বিউটিফুল। ইউ আর বিউটিফুল, বিকজ আই লাভ ইউ"। এর মাঝে এক খরগোশ সাইজ ছেলে এসে গটাগট কি যেনো লিখে গেলো। হয়তো কোরিয়ান কিংবা জাপানীজ।
আমি আলগোচে ব্যাগ থেকে কলম বের করি।
লিখতে চেষ্টা করি - "বাংলাদেশ"।
স্পষ্ট হলো না। ঐ প্লাস্টিক বোর্ডে লেখার জন্য মার্কার দরকার। খুঁজে পেলাম না আর। সেই মুহুর্তে একটি ক‌্যামরাঅলা মোবাইল আমার খুব প্রয়োজনীয় মনে হয়। কত কিছুই না হারিয়ে যায় স্মৃতি থেকে।

বিজি জিরো এইট ফাইভ, সিংগাপর থেকে ঢাকা। মাঝে ব্যাংককে বিরতি। সব মিলিয়ে ব্যাংকক থেকে উঠলাম পনেরো বিশ জনের মতো। সিংগাপুরের ভাইয়েরা এর মাঝে ফটো সেশনে ব্যস্ত। আমার সীট জে-টুয়েন্টি থ্রি; জানালার পাশে। বিমানে গান চলছে - "ধুম-মা-চলে, ধুম মা চলে। ধুম ধুম ধুম।"
এরপরে - "আআ গলে লাগ যা - - -"।

"স্যার, ও স্যার, এতো করে ডাকি শুনেন না।"
আমার পেছনের সীটের যুবক ভাই কাতর স্বরে ডাকছে। ছুটে এলো এয়ার ক্রু; তোমার ভাবী এইটা নিতে কইছে বিজ্ঞাপনের ফেমিকন হাজবেন্ডের মতো চেহারা। উনার নাম তৈমুর - "কী ভাই, কি সমস্যা?"
"স্যার, এতবার বললাম - মাথা ব্যাথার একটা ট‌্যাবলেট দেন, কেউ কথা শুনলেন না। এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে - - -"
তৈমূর ভাই ভালো লোক, "এক ঘন্টা হয়ে গেছে? কি বলেন?"
"জ্বী স্যার, ঐ ম্যাডামরে বললাম। ম্যাডাম বললো - মাথা ব্যাথা করলে ঘুম দেন, ভালো লাগবে।"
তৈমুর ভাই ছুটে গেলেন ট্যাবলেট আনতে।
আমি 'ঐ ম্যাডাম'কে দেখি। নীল শাড়ি পড়া আন্টি। কপাল কুঁচকে আছে। মনে হচ্ছে আজ সারাদিন রান্না করতে করতে উনি ক্লান্ত ভীষণ। তার উপর এতো উটকো মেহমানের ঝামেলা!
তৈমুর ভাই একটা ট্যাবলেট নিয়ে এলেন। সাথে এক গ্লাস পানি - "নেন ভাই, খেয়ে নেন"।
"স্যার, থ্যাংক ইউ স্যার। গত দুইরাত ঘুমাই নাই। মায়ের শরীর খারাপ, জরুরীভাবে দেশে যাইতেছি।"
আমি পেছনে তাকাই। আহারে, মা!

ছাড়ে ছাড়ে করে ছাড়লো এগারোটায়। আমার জানালা দিয়ে বিমানের ডানা দেখা যাচ্ছে। বিমান সাধারণত: ছাড়ার দু'মিনিট আগে থেকে ভিডিও ডেমনস্ট্রেশন দেখায়; বিটিভি'র মডেল সুইটি নির্দেশনা দিতো একসময় - বিমানে কিভাবে বসবেন, সীল্ট বেল্ট কীভাবে বাঁধবেন, অক্সিজেন মাস্ক কোথায় আছে, লাইফ জ্যাকেট কিভাবে পরতে হয়, ইমার্জেন্সি এক্সিট কোথায়; এসব। তারপর কোনো এক আয়াত পাঠ, সাথে বাংলা অনুবাদ যার কিছু লাইন এরকম - "আমাদের সফরের কষ্ট লাঘব করে দাও, সফরে বেদনাদায়ক দৃশ্য থেকে হেফাজত করো। পরিবার পরিজনের দায়িত্ব - - -"। এগুলো পড়তে পড়তে বিমান ওড়া শুরু করে।
এবার আর সুরা-কালাম পড়লো না। ভিডিও নেই। দুজন ক্রু লাইভ অভিনয় করে দেখালো - কিভাবে মাস্ক পড়তে হয়, কিভাবে লাইফ জ্যাকেটে বাতাস দিতে হয়।
সাউন্ড সিস্টেমে শোনা গেলো - ক্যাপ্টেন নুসরাতের গলা।
তিনি পরম করুণাময়ের কাছে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য দোআ প্রার্থণা করলেন।
আমি অপেক্ষায় থাকি কখন খাবার আসবে। খিদে লেগেছে বেশ।

চল্লিশ মিনিট পরে খাবারের ট্রলি এলো। নুডুলস, কেক আর চা/কফি। মন পেট কোনোটাই ভরলো না। সিটের পাশে হেডফোনের প্লাগ আছে। সুঠাম শরীরের ক্রু রায়ান (নাম ভুল হতে পারে) সাহেবকে ডাক দিলাম। হাসি দিয়ে জানালেন - "জ্বী না, হেড ফোনের ব্যবস্থা নেই।"
কী আর করা। জানালায় বাইরে তাকাই।
চাঁদের আলো পড়েছে বিমানের ডানায়।
হঠাৎ মাথার মধ্যে 'ধুলি মাখা চাঁদ' শব্দগুলো ঘুরপাক খায়। আরিফ ভাই'র উপন্যাসটা বইমেলায় কিনতেই হবে।
তারপর তৈমুর ভাই আমার সামনে। হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করি - "কেমন আছেন?"
ব্যাপারটা মনে হলো তার কাছে অপ্রত্যাশিত - "কিছু বলবেন?"
আমি বললাম - "আপনারা বিমানে কি সব সময় হিন্দি গান বাজান?"
পরিপাটি গোঁফেল চেহায়ার হাসি ফুটে ওঠে - "আসলে আমাদের এখানে সিস্টেম করা আছে। যখন প্লেন চলে তখন গান চালানো সম্ভব না, শুধু ট্রানজিটের সময়।"
বুঝলাম, আমার প্রশ্ন ঠিক হয়নি। আমার প্রশ্ন করা উচিত ছিল অন্য ভাবে, তাই আবার জিজ্ঞেস করি - "আপনারা কি শুধু হিন্দি গানই বাজান? নাকি বাংলা - ইংরেজিও?"
তৈমুর ভাই মনে হলো খুব খুশি - "আমরা বাংলা হিন্দি ইংরেজি, সব গান বাজাই।"
আমি মাথা নাড়ি - "আচ্ছা, আচ্ছা।"

দু'ঘন্টা দশ মিনিটের পথ যায় ধীরে ধীরে।
"আমরা আর দু'মিনিটের মাঝে ঢাকা জিয়া বিমান বন্দরে নামবো" ক্যাপ্টেন ইসরাতের গলা। ঠিক বুঝতে পারলাম না, নামটা কি - নুসরাত নাকি ইসরাত?
দেশের রানওয়েতে বিমানের চাকা ছুঁতেই মনে হয় - 'এ আমার দেশ। আমার মাটি।"
লাইটে কুয়াশার ছাপ। বিমান পুরোপুরি স্থির না হওয়া পর্যন্ত সবাই সীটে বসে থাকুন।
কিন্তু কে শোনে কার কথা?
আমি মোবাইলে সীম পাল্টাই। আমার অতি প্রিয় গ্রামীণের নাম্বারটি স্থগিত করা হয়েছে। মন খারাপ হয়ে গেলো। বেরুবার পথে গেটে দাড়ানো তৈমুর ভাই হাসি দিয়ে - খোদা হাফেজ বললেন। আমিও।

দ্রুত হেঁটে ইমিগ্রেশনে যাই।
তারপর লাগেজ বেল্টে অপেক্ষা। সবার ব্যাগ আসে আমারটা আসে না। না আসার সম্ভবনা বেশি। কারণ, যতবারই এসেছি ততবারই আমার ব্যাগ হয় হারিয়েছে, না হয় ভেঙে গেছে, না হয় অন্য কোনো ফ্লাইটে চলে গেছে। নানানজনের মাল-সামানা আসে। টেলিভিশন, অনেকগুলো কম্বল।
দাউদ মিয়া, জেলা মাদারীপুর।
মাসুদ করিম, চান্দিনা।
বিপ্লব বিশ্বাস, বাংলাদেশ।
শেষে আমার ব্যাগও আসে।
আবার সিক্যুরিটি চেকের লাইনে অপেক্ষা। দু'জন সামনে কৌশলে মেশার চেষ্টা করছে। সচেতন এক ভাই আওয়াজ দেন - হেই ভাই, লাইন ভাঙেন কেনো?
রাত একটা চল্লিশেও লোকজন করিৎকর্মা।

সিক্যুরিটি পার হলাম। শেষ গেইটে আরেকজন তেড়ে এলো - "ব্যাগে কি আছে?"
"বইপত্র জামা কাপড়।"
সাথের মহিলা এগিয়ে এলেন - "যান, আপনি যান সমস্যা নাই।"

ঢাকার ঠান্ডা বাতাস নাকে লাগছে।
শিরশির শীতল ভাব।
আর একটু দ্রুত হাঁটি, দৌড়াতে ইচ্ছে করছে। সামনের গেটেই উষ্ণতা।
অপেক্ষায় প্রিয় স্বজন।
.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP