07 February, 2008

সিনে-মারি-ভিউ : মহুয়া মুভিজের 'মেয়েরাও মাস্তান'

মফস্বল থেকে সরকারী চাকরীর বদলী সূত্রে অধ্যাপিকা শায়লা চৌধুরী তিন মেয়েসহ ঢাকা আসেন সিনেমার প্রথম দৃশ্যে। বড় মেয়ে মুনমুন, মেজো মেয়ে সোনিয়া, ছোটো মেয়ে নবাগতা। (বাণিজ্যিক বাংলা ছবির ব্যবসা সফল কম্বিনেশন। পরিচালক স্বপন চৌধুরী নি:সন্দেহে বুদ্ধিমান মানুষ।)

ঢাকায় নতুন আসা পরিবারটির জন্য বাসা বাড়ীর ব্যবস্থা করে অধ্যাপিকার প্রাক্তন ছাত্র নাসিম - আজাদ। নাসিম (নায়ক নাঈম) নামকরা আইনজীবি। যদিও মাফিয়া চক্রের বড়বড় মামলা ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহ নেই, টাকার সাগরে তার নিত্য গোসল। গোলগাল মার্বেল শরীর নিয়ে আইনের প্যাঁচে কিভাবে মামলা জিততে হয় সেটা নখদর্পনে। নাঈমের সাথে মুনমুনের একটু ইটিশপিটিশ চলছে, সেটা প্রাথমিক সংলাপেই আইডিয়া দেয়া আছে। (অতএব, দর্শক অপেক্ষা করে থাকো, দেখো কী হয়)। আকর্ষণ শেষ হয়নি এখনো। নাঈমের ছোটো বোন পলি আসে দৃশ্যে। (নায়িকা সংখ্যা তিন থেকে চার। পরিচালক অবশ্যই বাহবা পাবেন।)

অন্য ছাত্র আজাদ (আলেকজান্ডার বো) জাদরেল পুলিশ ইনস্পেক্টর। কাঁধ পর্যন্ত চুল, সাজানো গোঁফ। ভীষণ ন্যায়বান। হঠাৎ ফোন পেয়ে ছুটে যায়, এক মহিলা খুন হয়েছে পার্কে। গিয়ে দেখে নায়িকা সোনিয়া মাটিতে পড়ে আছে। হতবাক বো ছুটে গিয়ে মৃত সোনিয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে। ভেঁউ ভেঁউ। কিন্তু এ কী কান্ড! মৃত সোনিয়া এবার বো'কে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে। (বুঝা গেল, এটা নায়িকা সোনিয়ার সাজানো নাটক)। নায়ক ভীষণ বিরক্ত, কারণ তিনি পুলিশ অফিসার, এসব পিতলা পিরীত পুলিশি পোশাকে মানায় না। সেজন্যই (?) রাগের বশে সোনিয়াকে টেনে ধরে ভীষণ গাঢ় চুম্বন। তারপরে? তারপরে আর কি? যা হবার তাই হলো - গান। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে গান - এক ঝাঁক পাখি ওড়ে আকাশে, ভোরে ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে, চলো দুজন আজ হারিয়ে যাই পৃথিবীর শেষ প্রান্তে, এখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নাই। আইউব বাচ্চুর গগন বিদারী কন্ঠের সাথে ক্যামেরাম্যানের দুষ্টু চোখের উঁকিঝুকি।

মাত্র গেলো সিনেমার পনেরো মিনিট।
দর্শক ধরার প্রাথমিক কাজ শেষ।
এবার শুরু হয় অ্যাকশন পর্ব। মুনমুন-সোনিয়া জুটি ঢাকা শহরে শার্ট-প্যান্ট-স্কার্ট পড়ে ঘুরে বেড়ায়। ছিনতাইকারী পকেটমারদের ধরে আস্ত ধোলাই দেয়। সমবেত পুরুষদের লজ্জায় ফেলে কড়া সংলাপে - "আপনারা কাপুরুষের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছেন, আপনারা ভয় পান বলেই সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাস করতে সাহস পায়। প্রতিবাদ করতে না পারলে ঘরে বসে থাকেন। মেয়েরা এখন আর অবলা নেই। আপনরা পুরুষরা যেটা পারেন না, সেটা এখন আমরা মেয়েরা পারি।" (এই কাহিনী সংলাপ এর মালিক যোশেপ শতাব্দী)।

দুই নায়িকা শুধু রাস্তায় ঘুরে - দেখালে কাহিনী গাঁজাখুরি হয়ে যায়। সেজন্যই মুনমুন-সোনিয়া একটি কলেজে পড়ে, নাম বিদ্যারত্ন কলেজ। কলেজের ক্যাডার 'হিটলারের' সাথে প্রথম দিনেই বচসা বাধে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুনমুনের জিহাদ ঘোষণা, এবং সম্মিলিত মারামারিতে হাজির হয় নায়ক মেহেদি। মারামারি শেষ, মেহেদির বুকে মাথা রেখে পলির বিনীত প্রেম নিবেদন। উঁহু, মেহেদি মোটেও সেরকম নয়। বিএসসি পাস করেও মোটর মেকানিক মেহেদি হাত জোড় করে মাফ চায়, পলির জ্বালাতন থেকে মুক্তি চায়। এই ক্লাইমেক্সে আসে চিরাচরিত সংলাপ : 'ধনী আর গরীবের ভালোবাসা হয় না। আমি বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চাই না।' ইংরেজী সংলাপ : "আই হ্যাভ নো উইকনেস টু ইউ - আপনার প্রতি আমার কোন দূর্বলতা কখনো ছিল না, এখনো নেই।" অথচ পলি মেহেদির কাছে শুধু মনই চায়।

পরের দৃশ্যে পলি পুরুষ সেজে মেহেদির মোটর মেকানিক দোকানে যায়। গাড়ীর মনে হইতাছে করবোলেটরে তেল আইসে টাইপ সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে কিছু যৌথ ভাঁড়ামি। সাথে পাবেন - বিটিভির শুভেচ্ছা খ্যাত এবং মোল্লা সল্টের বিজ্ঞাপনের সেই, হ্যাঁ সে-ই পাপ্পুর কিছু কাতুকুতু দেয়া অভিনয়।

গেলো তিরিশ মিনিট।

এবার ভিলেনের আগমন। "ফুল - বেলাডিফুল, তুই আমার কথা শুনোছ নাই, তুই আমার ল্যাঞ্জায় পাড়া দিসোছ" - বলে আস্তে আস্তে এগিয়ে জ্যান্ত একটা মানুষকে বাঁকা ছুরি দিয়ে খুন করে ফেলে বাসু, শীতল সংলাপের কালো মাথার বড় বড় চোখের ভিলেন - ডিপজল। ডিপজলেরই ছোট ভাই কলেজের ক্যাডার হিটলার।

এবার চরিত্রগুলোর একটা লিংক পাওয়া গেলো। কাহিনীতে ড্রামা-সাসপেন্স আসে ক্রমাগত। মুনমুন-সোনিয়া-পলির শত্রু হিটলার, হিটলারের বড় ভাই ডিপজল, ডিপজলের প্রাইভেট ল'ইয়ার নাঈম, সরকারী পক্ষের পুলিশ নায়ক বো। এখানে নাঈম জয়ী, বো ট্রান্সফারড বান্দরবানে। তাহলে এখন কী হবে? কাহিনী কোনদিকে যাবে?

দর্শকের অপেক্ষার অবসান ঘটায় মুনমুনের অভিমান। এ অভিমান ভাঙাতে নায়ক নাঈমের ব্যাঙ লাফানি নাচ। আর নাচুনি বুড়ি মুনমুন ঢোলের বাড়ি পেয়েই চাকবুম-চাকবুম। ঘড়ির কাঁটা থেমে থাক, অনন্তকাল চলে যাক, সূর্যটা ডুবে যাক পৃথিবী ঘুমিয়ে থাক, ওগো সোনার মেয়ে তোমাকেই ভালোবাসি, ওগো অবুঝ ছেলে আমি তো তোমারই আছি। আইউব বাচ্চু - কনকচাঁপার মেলোডিয়াস গানের বিধ্বস্ত দৃশ্যায়ন। দশ্যি মেয়ে পৃথুলা মুনমুনকে ক্যামেরার ফ্রেমে আনার চেষ্টা স্পষ্টত:ই ব্যর্থ। অন্যদিকে লাফালাফির কবলে কুমড়াকৃতির নাঈমকে খুঁজে পাওয়া মুসকিল।

নাচ হলো, গান হলো, মারামারি হলো। এবার কি? হ্যাঁ কৌতুক সস্রাট দিলদার আর অয়োময়ের পাখাল আফজাল শরীফ হাজির। দুজনেই পুলিশের হাবিলদার। কলা খায় বেশী। প্রেমিকার খোঁজে উতলা। দিলদার খোজ পায় নাছরিনের। দু'জনের গভীর প্রেমের স্থুল সংলাপ। হাসানোর প্রানান্ত চেষ্টা, একটানা পঁচিশ মিনিট।

সিনেমা অর্ধেকে আসতে আসতে আরও কিছু মারামারি এবং মেহেদী-পলির বিয়ে। সাগরের ঢেউ হয়ে আছো তুমি মিশে, আমি আছি আকাশে, বাতাসে মিশে আমি আছি পাশে। বাসর সজ্জার ঘনিষ্ঠতায় এক চরম বিরহের গান। দর্শককে সুষ্পষ্ট ইংগিত দেয় সামনে বিপদ আছে। ঠিক। সে রাতেই সন্ত্রাসীদের হামলা, ছুরিকাঘাতে খুন হয় মেহেদী। আদালতে দফারফা। বোনের স্বামী খুনীকে অপরাধী প্রমাণে ব্যর্থ নাঈম মদের বোতলে শরাবময়। আর ভিলেন ডিপজল নিশি-উৎসবে মেতে ওঠে। সখী পরিবৃতা হয়ে "আমার রাজ্যে আমি আমি রাজা, ব্লাডি ফুল ফুল ফুল" নাচে গানে জলসা জমে।

এদিকে তিন নায়িকা একত্র হয়। স্বামী হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া পলি। আইনের উপর তাদের আস্থা নেই। আবারও যোশেপ শতাব্দীর পর্দা কাঁপানো সংলাপ - দেশে আইন বিক্রি হয় সেদেশে আইনের কোন মূল্য নেই, আমরা আইন মানি না, আমরা যা করবো সেটাই হবে আইন। শত্রুর মোকাবেলা হবে আমাদের প্রথম কাজ। প্রথম অভিযান হকি স্টিক দিয়ে শুরু। ডিপজলে সাংগপাংগ পরাজিত। প্রতিহিংসায় ডিপজল হানা দেয় মুনমুন-সোনিয়ার বাসায়। মুনমুনের মা অধ্যাপিকা শায়লা চৌধুরী খুন, ছোটো মেয়ের সম্ভমহানি এবং আত্মহনন। এসব ঘটনা পরম্পরায় মুনমুন-সোনিয়া-পলি অগ্নিরূপ ধারণ করে। কালো পোশাকে রাত হলেই অপারেশন। যেখানে অন্যায় অবিচার সেখানেই হানা। পত্রিকায় গরমাগরম রিপোর্ট। কারা এই লেভি রেমবো‌? পুলিশ ডিপার্টমেন্টে তোলপাড়।

সিনেমার নামকরণের সার্থকতা প্রমাণিত হলো - মেয়েরাও মাস্তান,।রাতভর অপারেশন। খুন হয় হিটলার। ভাই হত্যার প্রতিশোধে এবার ডিপজলও 'কোলোজ করা' (মেরে ফেলা) শুরু করে। লেডি রেম্বোরাও আগ্রাসী। তারা গেরিলা হামলায় পৌঁছে যায় ডিপজলের মদের আনন্দ জলসায়। ঝলমলে আলোয় আইটেম সং - "আমি দিওয়ানি, আরো কাছে এসো না, এই জওয়ানী লুটে নাও না"। নাচ গান শেষ করেই মাতাল ডিপজলের ওপর হামলা। ঢাকার রাস্তায় মাইলের পর মাইল দৌড়ানি। গুলি খেয়ে খুন হয় ডিপজল।

আদালতে কাঠগড়ায় হাজির তিন মেয়ে, সাজগোজে তখনো লেডি রেম্বো। আইনের কাছে সহজ স্বীকারোক্তি। তবে আইনজীবিদের লড়াইকে ম্লান করে দেয় তিন নায়িকার ঝাঁঝালো সংলাপ। তারা কেনো মাস্তান হলো, কেনো রেম্বো হলো এসব দগদগে ডজন খানেক প্রশ্ন বিচারকের কপালে ভাঁজ ফেলে দেয়। বিচারক অবশ্যই প্রাজ্ঞ মানুষ, তাই রায় হয় - যেহেতু অভিযুক্ত তিনজন সমস্ত অপরাধ করেছে সমাজে শান্তি আনা ও সন্ত্রাস দমনের জন্য সেহেতু আসামীদের সুস্থ জীবনের সুযোগ করে দিয়ে মৃত্যুদন্ডের বদলে পাঁচ বছরের কারাদন্ড প্রদান করে।

আশা করা গিয়েছিল - শেষ দৃশ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিন নায়িকা বের হয়ে আসবে, ফুলের মালা হাতে নায়করা এগিয়ে যাবে, আবার গান এবং সমাপ্ত লেখা ভেসে উঠবে পর্দায়। তেমন কিছু হলো না। আদালতের রায়ের পর স্কৃনে ভেসে ওঠে - বিবেকের বাণী - "দেশের আইন নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। সমগ্র দেশবাসীকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে হবে"।

আড়াই ঘন্টার সিনেমায় আমরা যা শিখলাম:
১) ছেলেরা আগে মাস্তান ছিলো, এখনও আছে। তবে এবার ছেলেরা একা নয়, সাথে মেয়েরাও মাস্তান।
২) কিছু করার না থাকলে স্লো ইন্টারনেট স্পিড নিয়ে আড়াই ঘন্টায় ডাউনলোড এবং আড়াই ঘন্টায় সিনেমা দেখা মিলিয়ে মোট পাঁচ ঘন্টা সময় কাটানোর অনেক উপকরণ এখন আমাদের হাতের নাগালেই - - -।
৩) টিকিট না কেনায় পয়সা উসুলের চিন্তা নেই। তবে পাঁচ ঘন্টার ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স হিসেবে আরও এক ঘন্টায় একটা রিভিউ লিখতেই হয়। :)

.
.
.

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP