21 December, 2007

ক্লান্তির পথ ভুলে থাকা

কোনোদিন আলাদা কিছু নয়,
কোনো স্থান আলাদা কিছু নয়।
আমরা নিজেরাই স্থানকে আলাদা করে ফেলি
দিনকে আলাদা করে ফেলি,
নিজের মাঝেই দিন, নিজের মাঝেই স্থান।

প্রায়ই ফোনে বলি, এই যে আমি নয়শ' পঁচাশি মাইল দূরে এটা আলাদা দেশ, আলাদা সীমানা; একান্তই রাষ্ট্রীয় বর্ডারের কারণে। নয়তো ঢাকা টু কুমিল্লা; দুই ঘন্টা। তেমনটা ব্যাংককও। টু আওয়ার্স ডিসটেন্স।

এসব বোধের মাঝেও কেনো জানি ঈদে পার্বনে মন খারাপটা জেগে ওঠে। গত ঈদে যেমন একটানা তিনদিন বন্ধ ঘরে ছিলাম, কেউ জানলো না। অথচ এ দিনটিও সাধারণ একটি দিন হতে পারতো। সাদামাটা একটি দিন। সেইম ডে, ডিফারেন্ট ট্র্যাশ। তাই এবারের ঈদে নেমন্তন্ন পেয়ে 'না' করিনি। সুযোগটা যখন পাতায়া-ব্যাংকক ছাড়িয়ে থাই-গ্রামে ঈদ কাটানোর তখন নিসংকোচে হ্যাঁ বলা যায়। এবং আমি বললাম।

প্রাসান ইয়ামেনফিন যার অ্যারাবিক নাম রফিক মুরাদ আমার সহকর্মী। প্রথম থেকেই প্রাসানের সাথে আমার আলাপ জমতো ভালো। মনে হতো - আমার কুৎসিত ইংরেজী বোঝার লোক এই একজনই আছে। সাথে যখন ধর্ম এবং আধুনিকতার এক প্রাণোচ্ছ্বল মানুষের সন্ধান পাই তখন মাইনরিটি সোসাইটির মুসলিম ব্রাদারহুডের একটা সীমানাও তৈরি হয়। বড় কারণ বোধ হয় - আলীগড় ইউনিভার্সিটিতে দুই বছরের পড়ালেখার কারণে আমার সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রাসানের খানিক হলেও জানা শোনা। তবে ইজিপ্টের আল-আজহার ইউনিভার্সিটির এই গ্র্যাজুয়েটের ভাবনায় কাঠমোল্লাদের নির্যাতনে বিরক্ত আমার মুগ্ধতা। এসব ফ্যাক্টস অ্যান্ড ইনসাইটস আমাকে এতটুকু বিশ্বাস দেয় - নতুন জায়গায় ঘুরা কিংবা জানার জন্য অন্তত: ভাষাগত দেয়ালে আঁটকাবো না। তাই কুরবাণীর ঈদের দিনটিকে সাদামাদা একটি দিন রাখতেই, মন খারাপের গন্ডিতে নিজেকে না আঁটকাতেই যাত্রা শুরু।

কথা ছিল সকাল ছয়টায় রওনা দেবো পাতায়া থেকে, আটটায় ইকামাই বাস টার্মিনালে প্রাসান থাকবে অপেক্ষায়। তারপর তার গ্রামের বাড়ী। সুবেহ-সাদেক-তন্দ্রা বিলাসী আমার চোখে খোঁচা লাগে ছ'টা চল্লিশে। ঘুমেই এসএমএস টাইপ করলাম - "নামাজ শেষে আটটায় রওনা দেবো, দশটায় ইকামাই পৌঁছবো"। ফিরতি এসএমএস - "ওকে।"

পাতায়া বাস টার্মিনালে টিকিট কিনে দেখি আটটার বাসে জায়গা নেই। সাড়ে আটটার টিকিট কিনে অপেক্ষা। ঈদের দিন বলে নাস্তার ইচ্ছে জেগে ওঠে। মিনিমার্ট থেকে স্যান্ডউইচ, জুস কিনে অপেক্ষা। রঙ-বেরঙয়ের মানুষ দেখা। আইপডটা তখনও পকেটে। হাতে মার্ক টোয়েনের "প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার", হয়তো আমি। বাসও ছাড়লো এক সময়। সাত সকালে বইয়ে মন বসে না। আইপডে ভরসা। শাহনাজ রহমতউল্লাহ আর মাহমুদুন্নবীর গানের তালে তালে সূর্য্যের আলো গাঢ় হয়ে আসে। আসে ফোনকল। ঈদ মোবারক। ইকামাই পৌঁছলাম সোয়া দশটায়। ট্যাক্সী ক্যাব ঠিক করে প্রাসান অপেক্ষায়।

জানলাম - প্ল্যান পাল্টে গেছে। প্রথমে প্রাসানের বাসা, তারপর গ্রামে। আমার সমস্যা নেই। কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই। সুতরাং জনস্রোতে মিশে যেতে মন চায়। সকালে স্টেশনে ফুয়েল কিনতে গিয়ে প্রাসানের গাড়িতে খোঁচা লেগেছে, সামনে সামান্য ফাটল ধরেছে। এরপরও আয়েশ করে চালানো যাবে। বিয়াল্লিশ বছরের প্রাসান, তার তেইশ বছরের গাড়ীর বাইরে হঠাৎ আমার মনে হয় - গতরাতে কী স্বপ্নে দেখলাম? ভাঙা একটা গাড়ি অদ্ভুতভাবে চালাতে চালাতে আমি কিভাবে পৌঁছে যাই ফার্মগেট, সেখানে আরমান পারভেজ মুরাদ কিংবা অন্য কেউ! স্টেশন থেকে প্রাসানের বাসা পনেরো মিনিটের পথ। তবে ব্যাংককের চিরকালীন জ্যামে আরো আঁটকা। পাতায়া থেকে আসার পথে পথে দেখেছি বিভিন্ন ব্যানার সাইনবোর্ড। নির্বাচনী প্রচারণা। এখানে প্রতীক নেই। সবার ব্যালট নম্বর। ব্যাংককে নেমেও দেখি একই অবস্থা। প্রাসানের সাথে এবার নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়। নির্বাচনে মূলত: প্রধান দুই দল। ডেমোক্র্যাট দল বনাম পিপল পাওয়ার পার্টি। থাকসিন সিনাওয়াত্রার থাই রাক থাই পার্টি ব্যানড। দলের লোকজন আপাতত: সমবেত পিপল পাওয়ার পার্টি নামে। প্রাসানের ধারণা - থাকসিন এখনো গ্রামাঞ্চলে প্রচুর জনপ্রিয়। এটা সত্য - থাকসিন দূর্নীতিবাজ। তবে অনেক উন্নয়ন করেছে। এমন কী ডেমোক্র্যাটদের যে নির্বাচনী মেনিফেস্টো - সেটাও থাকসিনের ধারণার কপি-পেস্ট। আলাপে আলাপে আমি আরও কয়েকটা ফোন কল সারি। গুরুত্বপূর্ন ছিল ঢাকা অফিসের নিসার ভাইয়ের জন্মদিন। পথে সেভেন ইলেভেনে গাড়ী থামিয়ে প্রাসানের মেয়ের জন্য কিছু চিপস, জুস, চকোলেট, ক্যান্ডি কিনে নিই। পারামকাও এলাকায় প্রাসানদের বাসা। পারামকাও শব্দার্থটা নিজের জন্য নোট করে রাখি। 'পা'রাম' মানে রাজা রাম, 'কাও' মানে নয়। রাজা নয় নম্বর রাম। ব্যাংককে অনেক রাস্তার নাম 'রামা থ্রি/ রামা টু' এরকম। প্রাসানদের বাসার আশেপাশে পৌঁছতে পৌঁছতে জানলাম এক সময় এ পুরো এলাকার মালিক ছিল তার দাদা কিংবা দাদার বাবা। পরের কোন এক জেনারেশনে সেলার হয়ে যায়। এর পরেও বিশাল এলাকা নিয়ে বাড়ী ঘর। থাই স্টাইলের হাউজ, অনেক পুরনো আস্তানা, সাথে আধুনিক দো'তল বাড়ী। হঠাৎ করে আমার মনে হয় আমি কবি জসীম উদদীনের 'ছুটির অবসরে'র লেখকের মতো বিপদে পড়লাম। সাদামাটা প্রাসানকে দেখে মনে হয়নি এমন তাল্লুক পরিবারের ছেলে। উপহার আরেকটু বেশি কিছু আনা দরকার ছিলো।

থাই বাড়ীগুলোর একটা কমন ব্যাপার চোখে পড়লো। নিচ তলায় ছোটো ছোটো কামরা থাকে না। হলরুম টাইপের বিশাল ঘর। সাজানো গুছানো। এখানে ড্রয়িং ওখানে ডায়নিং। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখলাম কাঁচঘেরা ঘরে প্রাসানের নানী শ্বাশুড়ী। অক্সিজেন নিয়ে মুমূর্ষু। পারামকাও হসপিটালের ডাক্তার নিয়মিত এসে দেখে যাচ্ছে। অনেকদিন যাবত সংজ্ঞাহীন অবস্থা। এই ফাঁকে জানি - প্রাসানের শ্বশুর পরিবার তার আত্মীয়ের মাঝেই লিংকড। এই নব্বইয়ের বেশী বয়েসী রোগাক্রান্ত মানুষটি বিশাল সম্পত্তির খানিক দান করে গেছেন গরীবদের জন্য। সেখানে মুসলিম স্লাম এরিয়া গড়ে উঠেছে। প্রাসানের চার বছরের মেয়ে লীনা, দেড় বছরের ছেলে নাওভী'র সাথে দেখা হলো। কাঁচ ঘেরা শোকেসে আমি অনেক পুরনো দিনের বাসন কোসন দেখি। থাই সৌকর্য্যের বাহার। নাস্তার এন্তেজামে আরাম করে ফ্লোরে বসি। 'খানোম চীন'; চায়নীজ নুডুলস দিয়ে শুরু, তেহারী, থাই কারি'র, পায়েশ এর পাশাপাশি ফলাদি। নাওভী কান্নাকাটি করে রমনীদের অন্দর মহলে চলে গেছে। লীনা দৌড়ে দৌড়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। এরমাঝে হাতে ক্যামেরা এসেছে। লীনার দিকে ক্যামেরা তাক করতেই মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। খেতে খেতে নানান গল্প হয়। হিজাবী কিছু কিশোরী তরুণী আশেপাশে দেখা যায়। আমার চোখ গিয়ে তাদের জিন্সে আঁটকে যায়। বিশাল জ্ঞাতি-গোষ্ঠী নিয়ে পরিবার বসবাস।

নিচে কুরবানীর গরুর মাংশ কাটা হচ্ছে। পুরুষরা বড় অংশ কেটে ছোটো করে দিচ্ছে। পাশে মহিলারা গোল হয়ে বসে আরো কাটাকুটিতে ব্যস্ত। আমার মাথা তখন থাই হাউজের খুঁটিতে লেগে গেছে। শত বছরের পুরনো বাড়ীর ছাপ। কালের প্রবাহে গঠন-পূণর্গঠন হয়েছে। উঠোনে কড়া রোদ। ভাবলাম - পরে ছবি তুলবো। আপাতত: বাইর থেকে ঘুরে আসি।

সামনের বৈঠকখানার পাশে কামরাঙা গাছ। সাধারণ লোকজন নাকি কামরাঙা তেমন পছন্দ করে না, কিন্তু শহুরে নাগরিক দাম দিয়ে শপিং মল থেকে কামরাঙা কেনে। এখানেও গাছেই পঁচে যাচ্ছে কামরাঙা।

খাঁ খাঁ রোদে যাত্রা হলো শুরু। গন্তব্য সোয়ামপোন প্রভিন্স। ব্যাংকক থেকে ৭৫ কিলোমিটারের পথ। তেইশ বছরের গাড়ী। পারামকাও ছেড়ে চলছে নতুন রাস্তায় শহরের বাইরে হওয়ায় যানজট নেই। অনেকটা ঢাকার তেজগাঁওয়ের মতো রাস্তা। পথে পথে দেখছি পিকআপ ভ্যানে করে নির্বাচনী প্রচারণা।

মূল শহর থেকে বেরুতেই শুন্য রাস্তা। দু'পাশে কেবল ধানক্ষেত। অনেক দূরে ঘর বাড়ী। কাকতাড়ুয়ার বদলে প্লাস্টিকের লম্বা টুকরা বাতাসে উড়ছে পতপত করে। প্রধান রাস্তা থেকে উপ-শাহরিক পথে যেতে চোখে পড়ে গরু-ছাগল। শতশত বক। চিরায়ত গ্রাম। রাস্তা খানিকটা খারাপ। সাইনবোর্ড দেয়া আছে - ড্রাইভ কেয়ারফুলি। এক মোড়ের নাম - হান্ড্রেড ডেথ সার্কেল। এ মোড়ে নাকি প্রচুর অ্যাক্সিডেন্ট হয়। মৃতের সংখ্যাও শতাধিক। ছবিটি ফেরার পথে তোলা। এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় চলতে চলতে আমার মনে পড়ে ২০০৪। রাজবাড়ী-পাংশা-কুমারখালী-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর। এমনই রাস্তা। শুনলাম - থাই এমপি'রা নাকি অপেক্ষা করে আরেকটু রাস্তা নষ্ট হোক। আরেকটা বছর যাক। এ বছরের বাজেটটা বাঁচাতে পারলেই হয়। আগামী বছরের ভাগ বাটোয়ারায় জমা থাক। কমিশন আর পার্সেন্টেজের চর্চা বাংলাদেশের মতোই। তবে পরিমাণে কম। হঠাৎ পার হলাম চমৎকার কারুকাজের এক বৌদ্ধ মন্দির। ঠিক করলাম - ক্যামেরা অন রাখি। ছবি না তুললেই মিস।

অবশেষে ঢুকলাম গ্রামের রাস্তায়। পাঁকা সড়ক। বাংলাদেশী স্টাইলে ধান শুকোতে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ ধান নিংড়ে দিচ্ছে। মানুষের পোশাক আশাকে সাজ সাজ ভাব। ঈদের দিন। কয়েক জায়গায় গরু জবাই হচ্ছে। এলাকাটি মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ। মাইনরিটি গ্রুপ ফিলিংয়ে একত্রে থাকা হয়তো নিরাপদ! অনেকেই শহর থেকে গ্রামে ঈদ করতে এসেছে। মজার ব্যাপার হলো গ্রামগুলোর কোনো নাম নেই। গ্রামের মাঝে খাল বয়ে গেছে। চাষাবাদের পানি সাপ্লাইয়ে সরকারী উদ্দোগে অনেক আগে খাল খনন হয়েছে। এই খালের সীমানা ধরেই গ্রামের নাম। যেমন - প্রাসানদের গ্রামের নাম - ক্যানেল নাইনটিন। থাই নামটা মনে পড়ছে না এখন। প্রথম ক্লিকে ধরা পড়লো গোয়াল ঘর। বাইরে কড়া রোদ। গরুগুলো যেন গরমে হাঁফিয়ে উঠেছে।

মোটর সাইকেলের শব্দকে ছাপিয়ে প্রাসানের গাড়ী গিয়ে থামলো তার স্কুলের সামনে। প্রাইমারী স্কুল। তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছরে অনেক এগিয়ে গেছে। সুন্দর ভবন হয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে।

সে সময় খালই ছিল যাতায়াতের প্রধান রাস্তা। নৌকা বেয়ে স্কুলে আসার স্মৃতিচারণে অপলক ধুলি ওড়ে। তিনটি সদ্য কিশোর দূর্দম সাহসে মোটরবাইকে টান দেয়।

গ্রামেও নির্বাচনী আমেজ। মোড়ে মোড়ে প্রচার।

থামলাম - এক ছোটোখাটোর চেয়ে একটু বড় এক দোকানে। পিপাসা লেগেছে খুব। ফ্রিজের কাঁচের ভেতর নতুন পানীয় হাতে নিই। চায়নিজজাত পানীয়ে চুমুক দিই। নিরিবিলি থাকার জন্য গ্রামের চেয়ে ভালো জায়গা নেই। আরেকটি গাড়ী এসে থামে দোকানের সামনে। শহুরে বেশভুষা। ঈদ উপলক্ষে গ্রামাগমন।

প্রাসানের সাথে ওরা সামান্য কথা বলে। আমি ক্যামেরায় দৃশ্য খুঁজি।

গাড়ী চলে। সাথে আমিও। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই। জমির আলের মতো কাঁচা পথ পেরিয়ে এক বাড়ীর সামনে। প্রাসানের মামা বাড়ী। সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ আতিথেয়তায় ঘরে নিয়ে গেলেন। তার ছেলে-বৌ নাতীরা গ্রামে ঈদ করতে এসেছে। ঘরের পেছন দিকে দাওয়া'র মতো খালি জায়গা। পাশে রান্না কর্নার। সোফা বাদ দিয়ে ফ্লোরে বসে আলাপ করি। নাকে ভেসে আসে আমাদের গ্রামের ঘ্রাণ। বাতাস বইছে তখন।
সিলিন্ডার গ্যাসের চুলায় খাবার তৈরি হয়। কুরবানীর মাংশ। গরম গরম পরিবেশনের আগে রুহ আফজা স্বাদে শরবত। বিশাল কেক। প্রাসানের মামীও এসে বসেন। আমার মনের কথাটাই মহিলা এক পর্যায়ে বলে ফেলেন - "আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমার সাথে আরো কথা বলি, কিন্তু ভাষা সমস্যার কারণে হচ্ছে না"।
প্রাসানের অনুবাদে বলি - "আমারও।"
কথায় কথায় কাঁচা বাঁধাকপির পাতা দিয়ে ঝুরঝুরে গরুর গোশতে কামড় দিই। এ কম্বিনেশনটা অসাধারণ। দেশে গিয়ে আবার ট্রাই দেবো। মামী এবার একটি বিয়ের কার্ড হাতে ধরিয়ে দেন। সামনের ২৫ জানুয়ারীতে মেয়ের বিয়ে। ব্যাংককে অনুষ্ঠান। আমি গেলে খুব খুশি হবেন। আমিও সবিনয়ে কৃতজ্ঞতা জানাই। খুব চেষ্টা করবো। পরম মমতার এ মানুষগুলোকে বিদায় জানিয়ে গাড়ীতে উঠতে আমার মনে হয় - কেনো এসব মানুষের সাথে দেখা হয়? আবার কখনো কি দেখা হবে? সময় বিকেল তিনটা।

এবার যাত্রা বিরতি ঈশা মাস্টারের বৈঠকে। প্রাসানের স্কুল শিক্ষক। ঝুলন্ত দোলনার উপর জমিদারী স্টাইলে বসে বসে ঝুলছে। পাশে তিনজন শ্রোতা। আমাদের নতুন চেয়ার দেয়া হয়। প্রাসান মন দিয়ে গুরুবাণী শোনে। কাঠের দোতলা বাড়ী। নিচটা খালি। উপরে নিবাস। কয়েক মিনিটের মাঝে ট্রে'তে করে পানি আসে, সাথে পুডিং টাইপ মিষ্টি। ঈশা মাস্টার আমাকে চমকে দেয় ইংরেজী বলে। থাইল্যান্ড কেমন লাগছে, ক'দিন আছি কিংবা থাকবো এসব আলাপ হয়। হঠাৎ এক ডেমোক্র্যাট দলের ক্যানভাসার এসে ভোট চেয়ে যায়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার তাদের প্রতিশ্রুতি - মসজিদ হবে অনেক। ধর্ম কি সব খানেই রাজনীতির হাতিয়ার?

এবার শহরে ফেরা দরকার। বিকেল হয়ে গেছে। একই পথে ফেরা। প্রাসানকে বলা আছে - কোথায় কোথায় গাড়ী স্লো করতে হবে। ছবি তুলবো। কিছু দূর যেতেই দেখি রাস্তার পাশে একটি গাড়ী নষ্ট হয়ে আছে। মানুষগুলো পরিচিত মনে হয়। সে-ই দোকানে যাদের দেখেছিলাম। প্রাসান গাড়ী থামিয়ে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে, তবুও ঠিক হয় না। শেষে তিন রমণী দুই শিশু আমাদের সংগী হয়। আমার আইপডে সাউন্ড সমস্যা করছে। সুমেধা'র যাদু হায় যেনো অনেক দূরের স্টেডিয়াম থেকে ভেসে আসছে।

বিকেলের তীর্যক রোদ লাগছে চোখে। এ রোদের কারণেই বৌদ্ধ মন্দির কিংবা অন্য ছবিগুলো ভালো হলো না।

শহরের আগেভাগে নামিয়ে দিতে গেলাম সংগীসাথীদের। অনুরোধ রাখতে হলো, একটুর জন্য হলেও আতিথেয়তা গ্রহণ করুন। বাড়ীটি নির্মানাধীন। পরিচয় হলো - বাড়ীর ছেলে মাহদীনের সাথে। বামরুনগ্রাদের অ্যারাবিক ইন্টারপ্রেটার। ঘরের মহিলাগুলো ইতোমধ্যে খানাদানা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। শরবত-পেয়ারা-ফিসবল শেষে আরও কিছু হাতে ধরিয়ে দেয়া। আমি ভাবছি - পাতায়া ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

গোধুলী বিকেলে আকাশটা লাল হয়ে গেছে। নির্বাচনী প্রচারের গাড়ীগুলো সারি বেঁধে শেষ মুহুর্তের আবেদনে ব্যস্ত। ইচ্ছে ছিল - অ্যাজাম্পশান (অ্যাবাক) ইউনিভার্সিটির ভালো একটি ছবি তুলবো, ট্রাফিক সিগন্যাল আর রোদের কারণে হলো না। বিশেষ করে বিশাল পতাকাটা মিস করলাম।

প্রাসানদের বাসায় ফিরে এখনকার হাউজের ছবি তুললাম। ফ্রেশ হয়ে খাবার না খেয়ে ঘরে ফেরার তাড়া। অনেকগুলো ছবি তোলা হলো না। অনেকগুলো গল্প হলো না। প্রাসানের বউ প্যাকেট করে রাতের খাবার দিয়ে দিয়েছে। ঘরে ফেরার জন্য এতো তাড়া কিসের জানি না।

দু'ঘন্টার পথ।
বকরবকর বাদ দিয়ে কানে আইপড চাপিয়ে দিই। ক্লান্তি লাগে।
আগামী কাল দেশে ঈদ।
কাঁচারী ঘরের সামনে কুরবানী।
শতশত পরিচিত মুখ - এসব থেকে দূরে সরে যাচ্ছি দিনদিন।
ঘরের সবাই এক সাথে কথা বলছে।
সরগরম আড্ডা।
মা-চাচীরা চা বানাতে বানাতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।
এ কোলাহলে বারবার আমার ঘুম ছুটে যায় - - -।

.
.
.

2 মন্তব্য::

আরণ্যক সৌরভ 29 December, 2007  

দুটো ঘন্টার দূরত্বে থেকেও একদিন আমরা দেখবো, যে জায়গাটায় আমি বা আপনি দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে দেশটাকে অনেক ছোট দেখাচ্ছে।
দেশ পড়ে গেছে অনেক অনেক পেছনে।

সেই দূরত্বটুকু আর তখন সময় দিয়ে মাপতে পারবেননা। কবে ঈদ, কবে কী, এইসব এখন আর মনে থাকেনা।
স্বার্থপর হয়ে গেছি - কী বলেন?
সময়ের দেনা থেকে মুক্তি নেই।

গ্রামের ছবি দেখে ভাল্লাগলো। আরেক বাংলাদেশ।

আনোয়ার সাদাত শিমুল,  29 December, 2007  

উঁহু।
আপনার কথাগুলো অসময়ের খেদ, রাগ, অভিমান।
ঘরে ফিরতেই হবে, সৌরভ।
সবাই ফিরে না, পারে না। কেউ কেউ ফিরে।
আরণ্যক সৌরভ ফিরবে। এটা আমি জানি।

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP