11 October, 2007

চিঠি

কলেজে পড়ার সময় ঢাকায় বিচ্ছিন্ন জীবন আমার। হঠাৎ মনে হলো - সবাইকে ছেড়ে এ কোথায় এলাম! সন্ধ্যা হলেই মন খারাপ। এক কিশোরের হু হু চাপা কান্না মুয়াজ্জিনের সান্ধ্য আজানের সাথে মিশে যায়। এভাবে দিন যায়। তারপর একদিন বাসার সবার কাছে, স্কুলের বন্ধুদের কাছে চিঠি লেখা শুরু করলাম। বিশাল বিশাল চিঠি; কোন ক্লাসে কি হলো, কোন স্যার কি রকম, বাসে কোনদিন কোন লোক কি কি ঝগড়া করলো এসব। মাস কয়েক পরে মনে হলো, এটার চেয়ে বড় কোনো থেরাপী নেই। পরীক্ষার আগের রাতে বই খোলার আগে চিঠি লিখি, মন ভালো হয়ে যায়। ভীষণ অভিমানী কিছু চিঠি লেখার পর মনে হয়েছে - পোস্ট না করি, থাক। আর পোস্ট করা হয়নি, অথচ মন খারাপটা কেটে গেছে।

ধীরে ধীরে মোবাইল এলো। কমলো চিঠি লেখা। বিশ্ব ডাক দিবসের স্লোগান হলো - 'চিঠি লিখুন, চিঠি স্থায়ী'। আমারও চিঠি লেখার অভ্যাস কমে গেলো। দু'য়েকবার যা-ও লিখতে হয়েছে ভীষণ ক্লান্তিময় চেষ্টা। দু'টাকার হলুদ খাম তখন কেবলই স্মৃতিময়তা। মিরপুর পোস্ট অফিসের বিবর্ণ দালানে যাওয়া হয় না তেমন। চাকরীর আবেদনে অনলাইন কার্যকলাপ। চিঠি লেখার দিনগুলো ক্রমান্বয়ে ধুসর হয়ে উঠে।

চিঠি লিখে উত্তর পাবো সেটা খুব বেশী হয়তো প্রত্যাশা করতাম না। তাই ফিরতি পত্র পেলে আনন্দের সীমা থাকতো না। স্কুল জীবনে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে রেডিও অনুষ্ঠানে চিঠি লিখেছি অনেক। সম্ভবত: সবচে' বেশী চিঠি বাংলাদেশ বেতার, ১২১ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতেই লিখেছি, এর আগে ১৫ নিউ বেইলী রোডে, তখনকার রেডিও বাংলাদেশ। প্রভাতী অনুষ্ঠান মহানগর, ম্যাগাজিন দর্পন, উত্তরণ। বিভিন্ন রকম সংগীতমালা। চিঠি পত্রের অনুষ্ঠান বিনিময়। একদিন হঠাৎ আমার ঠিকানায় এলো - বিজ্ঞাপন কন্ঠ নাজমুল হুসাইনের চিঠি। কী আনন্দের বিকেলই না ছিল সেদিন! পত্রিকায় 'শব্দজব্দ'এর ঠিকানা দেখে চিঠি লিখেছে বেশ কয়েকজন। কয়েক বালিকা প্রেম করার উদাত্ত আহ্বান নিয়েও চিঠি লিখেছিলো। বাসার সবাই হাসাহাসি। আর আমার সদ্য কৈশোরের অনভ্যস্ত লজ্জা। ডয়েচে ভেলে, ভয়েস অব অ্যামেরিকার মিতালী আর বিবিসির প্রীতিভাজনেষু-তেও চিঠি লিখতাম। সব চিঠির জবাব না পেলেও বছরের শুরুতে ক্যালেন্ডার, ভিউকার্ড, শুভেচ্ছাপত্রগুলো জমিয়ে রাখতাম যত্ন করে। এখনো দেশে গেলে ড্রয়ার খুলে পুরনো ফাইল বের করি। আলতো করে হাত বুলাই। ফিরে আসে পুরনো দিনের ঘ্রাণ।

বিদেশে আসার পর প্রথম দিকে খুব মেইল পেতাম। বন্ধু-স্বজনদের ই-পত্রে মেইল বক্স ভরপুর। তারপর ধীরে ধীরে ব্যস্ততা জীবনকে গ্রাস করে। ইনবক্সটা ফাঁপা হয়ে ওঠে। কখনো বা কর্পোরেট আদলে দুয়েকটা থ্যাংকস গিভিং মেইল, স্পেশাল ডে, জাস্ট টু কীপ ইন টাচ, পাবলিক রিলেশনের পারসোনালাইজেশন। গত বছর একদিন রুমে ঢুকেই চিঠি পেলাম, সাদা খাম - আগামী মাস থেকে বাসা ভাড়া বাড়ানো হলো। হায়রে চিঠি! আমিও মেনে নিই, বুঝি - বিষয় ও বাসনার বিষ অমৃততে।

শ্রম বাজারে টিকে থাকার জন্য, কেরাণী ঘরের রাজনীতিতে নিজেকে সামনের সারিতে রাখার জন্য অফিসিয়াল লেটার লিখতে হয় নিয়মিত। অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে ঋণাত্বক কথা বলতে হয়। লেসিকারের সবুজ কভারের বিজনেস কম্যুনিকেশন বই কিংবা লেসিকার যোগাযোগে নতুন প্রলেপ দিয়েছে। পাশের টেবিলের বাবুটির সাথে দিনে কথা হয় ৫ লাইন, ই-মেইল আদান প্রদান হয় ১৫/২০টি। মনে হয় - আশে পাশে কোথাও লেসিকার সাহেব উঁকি দিয়ে দেখছে, হাসছে আর বলছে - খেলারাম খেলে যা।

আজ শেষ বিকেলে ফোন পেলাম ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে - 'তোমার নামে চিঠি আছে'। হাসি পায়। আমাকে আবার কে চিঠি লিখবে। যতসব হাবিজাবি কোম্পানী তাদের নিউজ লেটার পাঠায়। নিতান্তই ব্যাবসায়িক ধান্ধা অথবা স্রোতে টিকে থাকা। কোথায় সে হলুদ খামের চিঠি! কোথায় সে ঘ্রাণ! ভীষণ অনাগ্রহে কমলা রঙের খাম হাতে নিলাম। টিএনটি। প্রেরকের ঠিকানা না দেখেই খুললাম। মুহুর্তের জন্য হলেও চোখ ভিজে উঠেছে। নাজমুল আহসান খান, প্রিয় নাজমুল ভাই। কার্ডে লেখা আছে -

Eid for eternal joy,
happiness for us all
you are a part of it
let's celebrate a colorful Eid!

আবার সেই পুরনো চিঠির ঘ্রাণ পেলাম আজ অনেকদিন পর।

কাল/পরশু ঈদ।
নীল নির্বাসনের পৌণপুঁনিক জীবন খুব কালারফুল হয়ে ওঠে না।

ব্লগের সকল সুহৃদকে ঈদ ও পূজার শুভেচ্ছা।
.
.
.

1 মন্তব্য::

ইরতেজা 23 October, 2007  

খুব ভালো লাগল ভাই। আমি একদম চিঠি লিখতে পারি না। তবে মেইল করি। তবে চিঠি আবেদন কি আর মেইল দিতে পারে। একটা ভাল চিঠি পেলে বার বার ছুয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। গন্ধ শুকতে ইচ্ছা করে।

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP