07 October, 2007

বৃষ্টির সন্ধ্যায় ভালোলাগা বিকিকিনি

পকেট খানিকটা ভারী থাকায় আজ সন্ধ্যায় কাঁচ ঘেরা তাপ নিয়ন্ত্রিত দোকানে বসি। প্রচন্ড খিদে নিয়ে গপাগপ কামড় দিই, মুরগীর বুক - রান। গলায় আঁটকে গেলে কোমল পানীয়ে চুমুক। ঝাঁঝে হয়তো চোখে পানি এসে যায়, তারপর - আলুর ফরাসী ভাজা; মরিচ টমেটোর সচে মাখিয়ে নিই। এ সময়টায় বারবার মিরপুর এসে আমার মনে হানা দেয়। আমার প্রিয় শহর, ভালোবাসার শহর, স্মৃতির শহর। বন্ধুত্বের শহর। দশ নম্বর গোল চক্করের গ্রামীণ রেস্তঁরা, চার টাকা দামের বড় বড় সিংগাড়া। তেতুলের সচ, সাথে শষা পিঁয়াজের সালাদ। ঘন্টা ধরে আড্ডা, গুটিকয় বন্ধু, প্রেম-অপ্রেমের সংকটে কারো উদ্ভ্রান্ত মন। অথবা আরেকটু দূরে একটু ঘষামাজা করে জমিয়ে উঠা পূর্ণিমা রেস্টুরেন্ট, তেল ছাড়া পরোটা, স্পেশাল চা - চিনি কম, দুধ বেশী। মাঝে মাঝে বাজারের মাঝখানে অদ্ভুত রহস্যময় চেহারার গম্ভীর চা দোকানদার, ঘন দুধের সর উঠা গরম চা। রিকশা ভাড়া বাঁচিয়ে দুটাকার বাদাম কিনে খেয়ে খেয়ে ঘরে ফেরা। এসব স্মৃতির হানাহানিতে টের পাই না কখন পাশের টেবিলের কিশোর কিশোরীগুলো উঠে গেছে। এসে বসেছে মধ্য বয়সের এক বাবা, সাথে তার দুই ছেলে মেয়ে। নিজের প্লেট থেকে, আমি আড়চোখে দেখি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তুলে দিচ্ছে ছেলের প্লেটে। অর্ধেক গ্লাস স্প্রাইট মেয়ের গ্লাসে।

আমার মা সেদিন ফোনে বলছিলো - 'তোর ওখানে কি বুট-পিঁয়াজো পাওয়া যায়? বেগুনি?'
আমি হাসি। বলা হয় না - 'আমার ভীষণ হালিম খেতে ইচ্ছে করছে আজ।'

সামনের টেবিলে দু'জন এসে বসেছে তখন। বাবার বয়েসী শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, সাথে প্রাক যৌবনা থাই কিশোরী। লোকটি বাবা নয়, কিশোরীটি মেয়ে নয়। কেউ প্রেমিক নয়, প্রেমিকা নয়। ভোক্তাপ্রধান সমাজে ওরা কেবলই ক্রেতা বিক্রেতা। এ সন্ধ্যায় ভালোবাসার নামে তারা নিরাপত্তা অথবা বিশ্বাস কেনার অভিনয় করছে। রোদে পোড়া খসখসে চামড়ার সাদা লোকটি তখন খুব কুৎসিতভাবে মেয়েটির গলায় ঘ্যাঁসঘ্য্যঁস শব্দে আদর করছে।

সিঁড়ি বেয়ে সুপার স্টোরে ঢুকি। গেটে দেখলাম - চার ভারতীয়কে আঁটকে দেয়া হয়েছে। সিক্যুরিটি এক এক করে বিল আর সওদা মেলাচ্ছে। এটা প্রায়ই চোখে পড়ে। দক্ষিণ এশীয় চেহারার প্রতি কিছু থাই হারামজাদার অহেতুক সন্দেহ আছে। তাদের কাছে ইউরোপ-অ্যামেরিকার সাদা চামড়ার লোক মানে ঈশ্বর, পকেট ভর্তি ডলার কিংবা দু'তিনটি ক্রেডিট কার্ড। দেদারসে কিনে নেয় - পন্য ও সেবা। অন্যদিকে কালো চেহারার লোকগুলো যেন শপিং সেন্টারে ঢুকে উইন্ডো শপিং কিংবা চুরির জন্য। আজ ভারতীয়গুলো খানিকটা ভড়কে গেছে। পাশ কাটিয়ে আমি ভেতরে যাই। সারি সারি দোকান। কিডস কর্নারে একটি বাচ্চা বায়না ধরেছে খেলনা গাড়ী কিনবে, মা'টি বাচ্চাকে শান্ত করতে পারছে না। আমি হাঁটতে হাঁটতে এপাশ থেকে ওপাশে যাই। আসলে কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই। তাই অহেতূক চলা। আচমকা টের পাই আমি ভিক্টোরিয়া'স সিক্রেট বিভাগে! হায় হায়, এলাম কই? দড়ি ছেড়া গরুর মতো ঢু মেরে জুতার শেলভের সামনে যাই। আরেকটু পরে - এক ষাটোর্ধ প্রেমিক ঝাড়ু কিনছে, সাথে অন্তসত্বা তরুণী প্রেমিকা। ট্রলিতে ডিটারজেন্ট পাউডার, নুডুলস, চাল, সবজি, মিস্টার বীনের থাই সিডি। দুজনের মুখ হাসি খুশি। মেয়েটি ভাবছে - এ অনেক সুখের জীবন, আর্থিক নিরাপত্তার চেয়ে বড় কিছু নেই। ধুসর চোখে বৃদ্ধ ভাবছে - শুধু শুধু জীবনের আসল সময়টা বরফের দেশে কাটিয়ে দিলাম, এমন কেয়ারিং বউ ইউরোপে কোথায়! থাই প্রেমিকাটিকে আপাত: ঈভ মনে হয়, সে অ্যাডাম। নিষিদ্ধ আপেল বলে কিছু নেই। ইস, কেনো আরো আগে দেখা হলো না দু'জনার! সুখী পরিবারের দৃশ্য থেকে আমি চোখ সরাই। ওরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মিলে না।

বাইরে এসে দেখি বৃষ্টি ভেজা পথ। তখনো থামেনি, বিরক্তিকর গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। টেম্পোর জন্য রাস্তায় দাঁড়াই। বৃষ্টি বাড়ছে। লাইনের টেম্পো আসলে আমি উঠে বসি। আরো তিনটি সীট খালি। আরো তিন জনের জন্য অপেক্ষা। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনের মিনিট। কেউ আসে না। বাকী সহযাত্রীরা চুপচাপ, কারো কোনো তাড়া নেই, অথচ আমার ভেতরে ভীষণ তাড়া। এ এক বিরক্তিকর অপেক্ষা। বৃষ্টি বেড়েই চলেছে। হঠাৎ ঝলক মেরে দুই রমণী গাড়ীতে উঠে। দু;জনই পুতিন মামার ভাগ্নী, রাসপুটিনের পাশের ফ্লাটে থাকতো একসময়। তুলনামূলক তরুণীটি আমার পাশে বসে। হাতে ম্যাপ। কী যেনো জিজ্ঞেস করলো। আইপডের প্লাগ সরিয়ে মনোযোগ দিই। রূপবতীর ডাক অগ্রাহ্য করলে রূপের অভিশাপ লাগে, কোথায় পড়েছিলাম (!), সেই অভিশাপের আগুন মারাত্মক। তাই আমি আলাপী হই। প্রশ্নের জবাবে জানাই - তরুণীর ধারণা ভুল, আমি মালয়েশিয়ান কিংবা ইন্দোনেশিয়ান নই। ম্যাপ ধরে আমি তাকে বুঝাই - এটা সুকুমভিত রোড, আমরা আছি সিটি হলের সামনে, বামে গেলে নর্থ, ডানে গেলে বীচ রোড ধরে সাউথ। বাইরে তখন ঝমঝম বৃষ্টি। আচমকা হাঁটু পানির জলদস্যুর কথা মনে পড়ে। জার্মানী থেকে কোনোভাবে এ দৃশ্য কল্পনা করলেই তার হানা দেয়ার সম্ভবনা ছিল। আমার কেন জানি মনে হয়, বৃষ্টি না থামুক, বাকীজন না আসুক, টেম্পো না চলুক। আমি ভুগোলের মাস্টার হয়ে শহরের পথ ঘাট চেনাই অনেকক্ষণ। এসময় তরুণীদ্বয় কী কী আলাপ করে নিজেদের মাঝে। চট করে বলে "আমরা সাউথে যাবো, ভুল গাড়ীতে উঠেছি" - দু;জনই নেমে পড়ে। তিন সীট খালী রেখেই টেম্পো তখন চলতে শুরু করেছে। আইপডে শ্রীকান্ত বৃষ্টি ঝরে, ঝরে মধুর দানায় - - -।

বৃষ্টি ভেজা কালো পিচের রাস্তা তখন সোডিয়াম আলোয় চিকচিক। আমার মনে হয় - ঘরে ফেরার তাড়া নেই কোনো। ইচ্ছে করে এ ঝমঝম বৃষ্টিতে হাঁটি অনেক পথ।
.
.
.

1 মন্তব্য::

ইরতেজা 23 October, 2007  

এত জীবন্ত লিখা। মনে হল সব চোখের সামনে দেখতে পেলাম।

ছোট্ট একটা দৃষ্টি আকর্ষণীয় অনুরোধ লিখার ফন্ট কি আরেকটু বড় করলে মনে হয় মন্দ হত না।

ধন্যবাদ

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP