04 October, 2007

কষ্টের নদী


ছেলেটি বড্ড নি:সঙ্গ। একা। রাতের নিস্তব্ধতা তাকে স্পর্শ করে না। একটি আধা তৈরি বাড়ির তিনতলায় শুয়ে আছে সে। ঠিক শোয়া নয়, আধশোয়া। কোমর পিলারের সাথে ঠেস দিয়ে মাথাটা উপরে তোলা। ছেলেটি চাপা হাই দেয়। গভীর রাতে পেঁচার ডাকের সাথে মিশে যায় সে শব্দ। উঠে দাঁড়ায় সে। ঠাস ঠাস করে ঝাড়া দেয় প্যান্টে। ধুলো কতটুকু ঝরলো দেখতে পায় না সে। দেখতে ইচ্ছে করে না তার। তারাহীন আকাশে তাকিয়ে থাকে কয়েক পলক। চাঁদ দেখতে ইচ্ছে করে। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। মায়ের কোল, আয় আয় চাঁদ মামা - - -। নিবিড় উষ্ণতা, গভীর ঘুম আর সিন্দাবাদ হওয়ার স্বপ্ন। মাত্র কয়েক বছরে স্বপ্নগুলো ঝরে গেছে ইউক্লিপটাসের রক্তশুন্য বাকলের মতো।

তারপর অন্য জীবন, অন্য স্বাধ, অন্য স্বপ্ন। প্রচুর ক্ষমতা। বড় নেতাদের বসার ঘর। আর রাতদিন অপারেশন। কিন্তু সব পাল্টে গেছে গত রাতে। ধরা পড়েছে তার দলের দু'জন। সে পালালো। আজ দ্বিতীয় রাত।

---খোলা আকাশ। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। ছেলেটি শুয়ে পড়ে। নিজেকে খসখসে শুকনো ঝরাপাতার মতো মনে হয় তার। ভাবতে ভাবতে চোখে জল এসে যায়। আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। কোন হিসাব মেলাতে পারে না। তার মনে হয় - থৈ থৈ কষ্টের নদীতে সে সাঁতার কাটছে। সে নদীর জলে জ্বলছে আগুন।


__________________

এতটুকু ছাপা হয়েছিলো বন্ধুসভায় ১৯৯৯ সালে, 'যে জলে আগুন জ্বলে' ফিচারে। সচলায়তনে দেয়ার পর, মন্তব্যের ঘরে কাহিনী এগিয়ে উস্কিয়ে দিয়েছিলেন ব্লগার দ্রোহী। তার সুত্র ধরে আমারও খানিকটা টান মারা। এ দুটি খন্ড নিচে -
_________________
_________________



দ্রোহী | বিষ্যুদ, ২০০৭-১০-০৪ ০৬:০০

কষ্ট সইতে পারে না সে একদমই। ছোটবেলায় যখন ব্যথা পেত কোথাও পড়ে গিয়ে - ভেউ ভেউ করে কান্না জুড়ে দিতো। তখন বাবা এসে কোলে তুলে নিতেন, পরম আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। তবুও তার কান্না থামতো না।

বাবা হাসতেন, আর বলতেন - আমার পাগল ছেলে। এভাবে কাঁদতে আছে? তারপর কান্না ভোলানোর জন্য বাবা তাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতেন।

মাঝে মাঝে যখন খুব ঘুরতে ইচ্ছা করতো। তখন সে ব্যথা পাওয়ার ছুতোয় কান্না জুড়ে দিতো। বাবা তখন তাকে বাইরে ঘুরাতে নিয়ে যেতেন।

"ধুর ছাই" বলেই ছেলেটি বিছানা থেকে উঠে বসে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। তারাহীন আকাশে চাঁদ খুঁজে বেড়ায় সে। মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। মায়ের কোল, আয় আয় চাঁদ মামা - - -।

হাতে ধরে থাকা মদের বোতলটা সজোরে ছুড়ে মারে জানালা দিয়ে। শক্ত পিচের রাস্তায় ঠনাৎ করে একটা শব্দ শোনা যায় - বোতলটা হাজারো খন্ডে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা রাস্তা জুড়ে। বোতল ভাঙার শব্দটা শুনে কেমন যেন এক অদ্ভুত রকমের আরাম বোধ হয় মনে। আবারও তার মনে হয় - থৈ থৈ কষ্টের নদীতে সে সাঁতার কাটছে। সে নদীর জলে জ্বলছে আগুন।

পাশে পড়ে থাকা মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে একটি বিশেষ নাম্বারে ফোন করে। অস্পষ্টভাবে কিছু কথা বলে সে। তারপর ফোনটা নামিয়ে রেখে হা হা করে হেসে উঠে। আজ সে উৎসব করবে। তার মরণ উৎসব। জীবন্ত ও মৃত মাংসের উৎসব।

চোখ বুঁজে কিছুক্ষন আনমনা হয়ে থাকে - জীবনের কোন অর্থ খুঁজে পায় না সে। শুয়ে পড়ে সে চিৎ হয়ে। আবারো মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা, মায়ের মুখ -মাথার ভেতরে টংকারে টংকারে আবৃত্তি হতে থাকে –

আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা॥

ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে সে – সেই ছোটবেলার কথা, সে শুয়ে আছে মায়ের কোলে। মা তাকে আদর করছে আর মধুর সুরে আবৃত্তি করছে।

আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা
আমার চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা॥

ঘুম ভাঙে দরজায় মৃদু করাঘাতের শব্দ। উঠে গিয়ে দরজা খুলতে ইচ্ছা করে না তার। দরজায় করাঘাত চলতেই থাকে। একসময় শব্দটা অসহ্য বোধ হতে থাকে, সে উঠে যায় - উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

“একি তুমি?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে সে। দরজায় দাড়িয়ে আছে তার একসময়ের ভালোবাসা। মেয়েটির নাম মিলি।

____________________
____________________



আনোয়ার সাদাত শিমুল | বিষ্যুদ, ২০০৭-১০-০৪ ০৯:২০

দরজা খুলে ছেলেটি মাথা তোলে তাকায়। মি-ম-মি-লি? নাহ! আসলেই নেশাটা বেশী হয়ে গিয়েছিলো। এখনো ঘোর কাটেনি। মিলি আসবে কোত্থেকে! ধ্যুত্। মনে হয় স্বপ্ন দেখছে। তারপর দু'হাতে চোখ কচলায়। নাহ, স্বপ্ন না। স্বপ্ন হলে এতো চোখ কচলানো যায় না। মাথাটা ঝাঁকি দেয় এবার। আরে এ তো শম্পা!
শম্পা! শম্পা!!! তুমি এ সাত সকালে?
মেয়েটি দরজা ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকতে চেষ্টা করে - 'দরজায় দাঁড়িয়েই কথা বলবে? নাকি ঘরে যেতে বলবে?'
ছেলেটি সরে দাড়ায়।
ঘরে ঢুকেই মেয়েটি বকবক করে। ছি:। কি বিচ্ছিরি করে রেখেছো ঘর! কি নোংরা! মশারীটাও আধ ঝোলা। মেঝেতে এতো সিগ্রেট কেনো? হু? এই অবস্থা কেনো?
ছেলেটি বিড়বিড় করে, 'না, মানে শম্পা। তুমি এই অসময়ে কোত্থেকে এলে?"
-"এই ছেলে বদমায়েশ, মানুষ চেনো না? উফ!!! মুখে কি গন্ধ। কি সব ছাইপাশ গিলেছিস? আমাকে চিনিসনি এখনো? আমি শম্পা না, আমি শম্পার টুইন সিস্টার চম্পা।"
- চম্পা? ছেলেটি অবাক হয়। ভালো করে তাকিয়ে দেখে চিবুকের বাম পাশের তিলটি নেই। আসলেই তো।

শম্পার ঐ তিলে তাকিয়ে ছেলেটি কতো কী-ই না ভেবেছে একসময়। মৌলি'র আড্ডা, ফান্টার স্ট্রতে চুমুক দিয়ে শম্পার অনবরত মাথা নাড়া। ছেলেটি প্রবল অপেক্ষায় থেকেছে, কখন ঐ মাথা নাড়া বন্ধ হয়ে 'ভালোবাসি' শব্দটি ধ্বনিত হবে! ঘন্টার পর ঘন্টা কেটেছে এইভাবে। ভেনিলা আর স্ট্রবেরী ফ্লেভারের আইসক্রীম শেষ হয়েছে প্রতিদিন। তবুও ছেলেটি অপেক্ষায় ছিলো। মানিব্যাগ হাল্কা হয়ে এলে কেন্দ্রের সায়ীদ স্যারকে মনে পড়ে - 'রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে, বই খানা - - -'।
ইস! শম্পার পেছনে এতো খরচ না করে, আবুল কালাম শামসুদ্দিনের 'কাগজের বৌ' কেনা যেতো প্রতিদিন। তবুও আশাহত হয়নি সে, আশা ছিলো - শম্পার কালো তিল হারিয়ে যাবে না।

চম্পার চিৎকার ছেলেটির ভাবনায় ভাঙন ধরায় - "কি বলছি শুনছো?"
ছেলেটি মাথা নাড়ে।
- "আমার বোনটার তো মাথা খেয়েছ। ঐ ঘরের জামাই হবার স্বপ্ন দেখো, একবারও খবর নিয়েছো ঘরের বড় জামাইয়ের কি অবস্থা?"
ছেলেটি অবাক হয়।
বড় জামাই! মানে, কী যেনো ঐ হালার নাম? সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতেই তো পড়তো, এখন আমেরিকা থাকে, ব্লগেও লিখে। একবার নীরব হোটেলে শম্পাসহ লাঞ্চ করতে গিয়ে আচমকা ঐ ভিলেন সামনে এসেছিলো। সে-কী ধমক। শম্পা তো ভয়ে নীল হয়ে গিয়েছিলো। ছেলেটি মনে মনে ভেবে রেখেছে - আমিও ঐ ঘরের জামাই হবো, তারপর দেখে নেবো একদিন।
খানিকটা সামলে নিয়ে চম্পাকে বলে - "কি হয়েছে বড় জামাইয়ের?"
- "পাসপোর্ট হারাইছে"।
- মানে?
- হ, সাথে আরও কি সব জরুরী ডকুমেন্ট হারাইছে। এখন দুই বছরেও দেশে আসতে পারবে না।
ছেলেটি খুশি হয় মনে মনে। এ যেনো ভাগ্যের খেলা। কি নিষ্ঠুর প্রতিশোধ। তবুও বলে - "আমি কি করবো? শম্পাকে তো আর পাবো না। আপনারা তখন ঐ মোহাম্মদ মেজরের কাছে শম্পাকে তুলে দিলেন।"
চম্পা এবার কান্নায় ভেঙে পড়ে -"প্লিজ একটা কিছু করো। হাজার শত্রুতা থাকলেও তোমাদের মিডল নেমে মিল আছে।"
- মিল? কিসের মিল? ওহ! আরে শুনো চম্পা, আমার নামে আছে 'সুন্দর'এর স। আর ঐ হারামীর নামে আছে - 'শয়তান'এর শ। আর আমার নামে 'হা' নাই। ঐ আমেরিকান শয়তানটা সব সময় 'হা' করে থাকে, তাই তার নামে 'হা' আছে।
- চম্পা এবার হু হু করে কাঁদতে থাকে। ও গো তুমি ভুল বুঝো না। বড় দুলাভাই নয়, আমিই শম্পার সাথে তোমার সম্পর্ক ভেঙেছিলাম। আমি, আমি, আমি।
- তুমি? তুমি? কেনো? কেনো তুমি শম্পা আর আমাকে আলাদা করলে? কী ক্ষতি আমি করেছি তোমার। আমি কি তোমার মাশকারা দেয়া চোখে শ্যাম্পু মেখেছি?
চম্পার কান্না থামে না। ভেঁউ ভেঁউ শব্দে মাতম উঠে -"তুমি কি মানুষ, নাকি অন্য কিছু। তোমার কি মন বলে কিছু নেই? খোদা কি তোমার হৃদয়টা পাথর দিয়ে বানিয়েছে? এখনো বুঝলে না, আমি তোমাকে কত্তো ভালোবাসি!"
ছেলেটির মনে হয়, এক আগুনের নদীতে সে সাঁতার কাটছে সে। সামনে দাড়িয়ে থাকা চম্পাকে মালেকা হামিরা মনে হয়, পরক্ষণেই সে বানেছা পরী হয়ে উঠে।
এ উন্মাতাল পরিবেশে মনে হয় সুনামী নামছে পৃথিবীতে। তখন হঠাৎ কলিং বেল বাজে। দরজা খুলে দেখে শম্পার বড় দুলাভাই দাড়িয়ে। বলে - ' আজ সকালেই দেশে এলাম। তোমার বাসায় চম্পা আছে?'
ছেলেটি চুপচাপ।
সাথের লোকটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়, উনি জার্মানি থেকে এসেছেন - - -

___________________
___________________


এর বাকী অংশ ছিলো জমজমাট। "একটি অমীমাংসিত বাংলা ছায়াছবির গল্প" শিরোনামে কামাল করেছেন দ্রোহী। সে অংশটুকু পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে---

.
.
.
.

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP