16 September, 2007

আড়াল

রাতে বালিশের পাশে থাকে মোবাইল ফোন আর টিভির রিমোট। ইদানিং প্রায়ই এ সমস্যা হয়। মোবাইলে রিং হলে রিমোটের বাটন টিপে কানের কাছে নিয়ে হ্যালো হ্যালো করি। ঘুমের ঘোরে বেশ কয়েকবার হ্যালো হ্যালো বলে টের পাই মোবাইল তখনও বেজে চলেছে। গতরাতেও এমন হলো। ভীষণ বিরক্তি নিয়ে হ্যালো বলতেই শুনি - 'কীরে এখনো উঠিসনি? সেহরী খাবি না?'
আমার বলতে ইচ্ছে করছিলো - 'খালা তুমি কি শেষ পর্যন্ত জাগরক পার্টির সভাপতি হলে যে মাঝ রাতে সবাইকে ডেকে ডেকে ঘুম ভাঙাচ্ছো?'
ঘুমের চাপে বলা হলো না। বরং শুনলাম, 'তোদের বাসায় কি ধর্ম কর্ম একেবারে উঠে গেছে? কেউ নামাজ রোজা করে না?'
সিতারা খালার ফোন। সিতারা খালা একটানা বলে চলেছে।
আমি লাইট জ্বালিয়ে ঘড়িতে সময় দেখি রাত আড়াইটা।
বললাম - খালা, এখন সময় হলো রাত আড়াইটা। এখন উঠে কি করবো? সেহরী খাবো চারটার দিকে - - -।
খালা এবার হাই তোলে - ' ও, আচ্ছা। তোকে বলা হয়নি, আজ বাসায় সেহরী পার্টি হচ্ছে। আমার অ্যাপার্টমেন্টের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছি, আমার বাসায় এসে সেহরী খাবে। তাই তাড়াতাড়ি উঠতে হলো।'
আমার আক্কেল গুড়ুম - 'ইফতার পার্টির নাম শুনেছি অনেক। সেহরী পার্টি তো নতুন আইডিয়া, এটা কি - - -।'
খালা আমাকে থামিয়ে দেয় - 'আসলে নামটা সেহরী পার্টি না। সাহুর মজলিশ। সবাই একসাথে সেহরী খাবো, তারপর জামায়াতে নামাজ হবে, নারী-পুরুষ আলাদা ব্যবস্থা। নামাজের শেষে বয়ান হবে। তোর খালু গ্রামে যে মাদ্রাসা করেছিলো ওখানকার প্রিন্সিপাল সাহেবকে ঢাকায় এনেছি, উনি বয়ান করবেন।'
আমি কি বলবো বোঝতে পারলাম না।
খালা বললেন - 'নানান ঝামেলায় তোকে জানানো হয়নি। তুই কি এখন আসতে পারবি?'
আমি আঁতকে উঠি - এতো রাতে - - - ?
- 'তাহলে এক কাজ কর, সকালে চলে আয়। বয়ানে হাজির হতে পারবি।'
আমি গাঁইগুই করি - 'কালকে সকাল নয়টায় একটা ইন্টারভিউ আছে গুলশানে, বাসা থেকে বের হবো আরো আগে - - -।'
- 'তাহলে তুই ইফতারে আয়। কাল আট্রিয়ামে একটা ইফতার পার্টি দিচ্ছি, ব্যুফে। অফিস-ফ্যাক্টরী মিলিয়ে পঞ্চাশ জনের মতো হবে। তুইও আয়।'


২.
বিকেলে খালার বনানী বাসা থেকে রওনা দিই। পথে বনানী গোরস্তানে খালুর কবর জেয়ারতে আমিও সামিল হলাম। গাড়িতে উঠে খালা সীটের পেছনে রাখা নেয়ামুল কোরআন পড়া শুরু করলেন। গাড়ী গুলশানের জ্যামে পড়ে আছে। খালার গাড়ীতে সব সময় সানন্দা/দেশ থাকতো। সীটের পেছনে সাজিয়ে রাখা হতো যাতে বাইর থেকে দেখা যায়, স্ট্যাটাস সিম্বল, অনেকটা বই দিয়ে ড্রয়িং রূম সাজানোর মতো ব্যাপার। রমজান মাসে দেশ/সানন্দার বদলে ধর্মীয় বই স্থান করে নিয়েছে।

৩.
ব্যুফে ইফতারে ওভারলোডেড হয়ে বারিধারায় প্রগ্রেসিভ উইমেন সোসাইটির অফিসে ঢুকে খালা আমাকে বিদায় দেয়। আজ রাতে খালাদের ক্লাবে কী কী নাকি অনুষ্ঠান আছে। আমি বাসায় ফেরার পথ ধরি।

৪.
গুলশান মোড়ে এসে পকেটে হাত দিয়ে দেখি মোবাইল নেই। বুকটা ধুক করে উঠলেও মনে পড়লো - ফেরার পথে খালা আমার ফোন থেকে কাকে যেন ফোন করেছিলেন। পরে আর নেয়া হয়নি। আবার ছুটলাম বারিধারায়। ক্লাবের গেটে এসে দারোয়ানকে সিতারা খালার নাম বললাম। মিনিট বিশেক পরে খালা বেরিয়ে এলেন। আমার হাতে মোবাইলটি দিয়ে - 'সাবধানে বাসায় যাস' বলে ভেতরে চলে গেলেন। এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমি অন্যমনস্ক হয়ে উঠি। মাথার ভেতর অনেকগুলো স্রোত এসে ঢেউ তোলে। সিতারা খালার সঙ্গে আসা এবং চলে যাওয়া ঘ্রাণটা আমার খুব চেনা চেনা মনে হয়।

আলোকোজ্জ্বল বারিধারায় রাস্তায় তখন আমি হাঁটতে থাকি, একা একা।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP