05 September, 2007

দিনলিপি: বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখকে স্মরণ

ব্লগিং দিনলিপি না সাহিত্য এ নিয়ে আলাপ জমেছিল সচলায়তনে। আলোচনা পড়ে এবং সামান্য কয়েকজন রেগুলার ব্লগারের সাথে কথা বলে আমার ধারণা - ব্লগিংয়ের সূচনা হয়েছিল ওয়েবে দিনলিপি লেখার প্রয়াসে। সেখানে ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ইন্টারেস্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছে, দৈনন্দিন জীবনের নিয়ামক অর্থনীতি-সমাজ-রাষ্ট্রের পাশাপাশি সাহিত্যও উঠে আসছে প্রাসংগিকভাবে। পারস্পরিক জানাজানির সুযোগ ঘটছে।

আমি কখনো সেভাবে দিনলিপি লিখতে পারিনি। ভীষণ একঘেঁয়ে সাদামাটা জীবনের বয়ান নিয়ে কী-ই বা আর লেখা যায়! পত্রিকার পাঠক পাতায় এক সময় পরবাসী বন্ধুদের লেখা পড়তাম। বাংলা না বলে থাকা, বিদেশী বন্ধুদের মাঝে হাসি মজা, সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেশের জন্য মন খারাপ করা। উইকএন্ড মানে ম্যাকডোনাল্ডসে কামড়, দু'ঢোক কোক। ভেজা চোখ। আহারে! পরবাসী মনের হাহাকার। ঐসব দু:খ বিত্তান্ত শুনেও খানিকটা ঈর্ষান্বিত হতাম সেসময়। অথচ এখন, জানি না কোন এক কারণে এখন আমার কাছে এসবই বিলাসিতা মনে হয়, দু:খ বিলাস। বাজার উপযোগী ডিগ্রি নিয়ে শ্রম বাজারে প্রতি মুহুর্তে টিকে থাকার চেষ্টা, কিংবা কেরাণী ঘরে বাবুগিরির রাজনীতির নিত্য ইঁদুর দৌঁড়ে আমি যখন ম্যাটাডোরের ষাঁড় তখন দেশের জন্য মন খারাপ করা কোন লেখা লিখতে পারি না। কেবলই মনে হয়, অন্যায় হয়ে যাবে নিজের সাথে। বাথ-সাতাঙের লোভে আমিই পা দিয়েছি পরবাসে, প্রিয়তম স্বদেশ তো আমাকে দূরে ঠেলেনি!

_________
দুপুরে খেয়ে কামলাগিরির ফাঁকে অনলাইনে বাংলা পত্রিকায় চোখ বুলানো নিত্য অভ্যাস। পছন্দের শেষের দিকের এক পত্রিকায় হঠাৎ চোখ থামলো - "বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের শহীদ দিবস আজ"। প্রথম সারির দৈনিক বলে পরিচিত অন্য পত্রিকায়গুলো ভালো করে দেখলাম - হোমপেজে কোনো খবর নেই। দুই নেত্রী জেলে কি খাচ্ছেন, কি পড়ছেন, কখন ঘুমোচ্ছেন, প্রেসিডেন্ট পার্কে কে এলো কে গেলো, কিংবা পাকিস্তানে বোমায় কয়জন মারা গেলো ছবিসহ তার বিবরণ। আরও আছে বৃদ্ধের ঘুষিতে আরেক বৃদ্ধ নিহত, কিংবা পরকীয়ার বলি শিশু খুনের বিবরণ। কোথাও জায়গা হয়নি - বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ স্মরণের!

বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের জন্ম-মৃত্যু তারিখ মুখস্ত রাখতে ব্যর্থ আমি, সব সময় পত্রিকাগুলোই মনে করিয়ে দেয় নানা সূত্রে। গুগলে সার্চ করে উইকিপিডিয়ায় পাওয়া বিবরণের অংশ বিশেষ -

"১৯৭১- এর ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষার সামনে গোয়ালহাটি গ্রামে নূর মোহাম্মদকে অধিনায়ক করে পাঁচ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হঠাৎ পাকিস্থানি সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষন করতে থাকে। পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষন করা হয়। তবু পেট্রোলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এক সময়ে সিপাহী নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে নূর মোহাম্মদ নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এল.এম.জি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গোলা এসে লাগে তাঁর ডান কাঁধে। ধরাশয়ী হওয়া মাত্র আহত নান্নু মিয়াকে বাঁচানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। হাতের এল.এম.জি সিপাহী মোস্তফাকে দিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে যেতে বললেন এবং মোস্তফার রাইফেল চেয়ে নিলেন যতক্ষণ না তাঁরা নিরাপদ দূরুত্বে সরে যেতে সক্ষম হন ততক্ষণে ঐ রাইফেল দিয়ে শত্রুসৈন্য ঠেকিয়ে রাখবেন এবং শত্রুর মনোযোগ তাঁর দিকেই কেন্দ্রীভুত করে রাখবেন। অন্য সঙ্গীরা তাদের সাথে অনুরোধ করলেন যাওয়ার জন্যে। কিন্তু তাঁকে বহন করে নিয়ে যেতে গেলে সবাই মারা পড়বে এই আশঙ্কায় তিনি রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। বাকিদের অধিনায়োকোচিত আদেশ দিলেন তাঁকে রেখে চলে যেতে। তাঁকে রেখে সন্তর্পণে সরে যেতে পারলেন বাকিরা। এদিকে সমানে গুলি ছুড়তে লাগলেন রক্তাক্ত নূর মোহাম্মদ। একদিকে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী, সঙ্গে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র, অন্যদিকে মাত্র অর্ধমৃত সৈনিক (ই.পি.আর.) সম্বল একটি রাইফেল ও সীমিত গুলি। এই অসম অবিশ্বাস্য যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের এমন ক্ষতিসাধন করেন যে তারা এই মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে বিকৃত করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে।"

গুগল সার্চে পেলাম ব্লগার সাব্বিরের একটি পোস্ট। গত বছর এইদিনে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের শহীদ দিবসের খবর তিনি পেয়েছিলেন কোনো এক পত্রিকায় ১৭ পৃষ্ঠায় খুব ছোট্ট একটি আইটেমে।
বিকেল ঘুরে দেখলাম সুপ্রিয় ব্লগার অচেনা বাঙালি স্মরণ করেছেন দেশের এ সোনালী সন্তানকে। তাঁর প্রতি সবিশেষ কৃতজ্ঞতা।

__________
দিনলিপি লিখতে গিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখকে স্মরণ করলাম। হয়তো আনুষ্ঠানিকতা হয়ে গেলো পুরোটাই। বছরের এই একটি দিনে ঘটা করে তাঁদের স্মরণের দরকার আছে কিনা সে প্রশ্নও উঠবে হয়তো। কারণ, চারপাশে শুনছি ৩৬ বছর আগের 'গন্ডগোল' নিয়ে মানুষ অযথা ইমোশনাল হচ্ছে।

আসলেই অযথা?

আমার ভাবার সময় কোথায়? বুকাজিন শপে ৫০% ডিসকাউন্টে ওরান পামুকের 'ইস্তাম্বুল' বিক্রি হচ্ছে, সেভেন ইলেভেনে কোকাকোলা জিরো - বাই ওয়ান, গেট ওয়ান ফ্রি। কোকে চুমুক দিয়ে, ইস্তাম্বুলের পাতা উল্টে কাল-পরশু না হয় আবার দেশপ্রেমের দু:খবিলাসী পোস্ট দিবো! ততক্ষণ, ভালো থেকো বাংলাদেশ।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP