12 August, 2007

রুমাকে বললাম, আজ ধুসর গোধুলির জন্মদিন

সাত টাকায় প্রাণ কোলা খেতে গিয়ে ক্রাউন উল্টে আমি কিভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ দেখার জন্য জার্মানি যাবার টিকিট পেয়ে গেলাম আপনাদের কাছে সে গল্প এতোবারই করেছি যে আপনারা নির্ঘাৎ বিরক্ত হয়ে এবার 'পোস্টে আপত্তি জানান' এ ক্লিক করে দিবেন। এমনিতেই আমার বন্ধুমহলে ইদানিং ঝামেলা হচ্ছে। আমি নাকি সুযোগ পেলেই জার্মানি, ফুটবল, শীতের দেশ, লাল পানি, ইউরো এ ব্যাপারগুলো আলোচনায় নিয়ে আসি। এবং টুপ করে শুরু করি আমার জার্মান যাত্রার গল্প। তাই এবার জার্মান যাত্রার আনন্দময় গল্প নয়, বলবো - জার্মান যাওয়ার পর এক ভীষণ বিপদ এবং বিপদ থেকে মুক্তির গল্প।

আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, জার্মানির গল্প করতে গিয়ে আমি বরাবরই ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে এমিরাতের ফ্লাইটে ওঠে বসা পর্যন্ত বলে শেষ করি। আর আগাই না। এমন কি আমার দুষ্টু বন্ধুদের যারা এমিরাতের এয়ারহোস্টেজের খানিকটা ডিটেইল জানতে চেয়েছিল তাদের দিকে বরং আমি ভুরু কুঁচকাই। যাই হোক, এমিরাতের ফ্লাইটে ভীষণ উত্তেজনা নিয়ে যখন অপেক্ষা করছি জার্মানিতে কি দেখবো, কি খাবো, কি করবো; তখনও জানতাম না আমার জন্য এ কোন বিপদ অপেক্ষা করছে হিটলারের দেশে।

ইমিগ্রেশনের ঝামেলা খামেলা পার হয়ে ডাসেলডর্পে থেমে নিজের ব্যাক পকেটে হাত দিয়ে দেখি, মানিব্যাগ উধাও। বঙ্গবাজার থেকে দুইশ আশি টাকা দিয়ে কেনা জ্যাকেটের এ পকেট ও পকেট হাতড়ে বেড়াই, মানিব্যাগ নাই। প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যেও আমার কপাল ঘেমে গেছে, ঘাড় বেয়ে ঘাম ঝরছে। সাথে ডলার যা এনেছিলাম সব ঐ মানিব্যাগেই ছিল। এখন আমি কি করি, কোথায় যাই। এই অচেনা দেশে কে আমাকে আশ্রয় দেবে? কিভাবে মানিব্যাগ হারালো ভেবে কুল কিনারা পাই না। এমিরাতের ফ্লাইটেও কি তবে পকেটমার আছে? ঢাকা শহরের মুড়ির টিন থেকে শুরু করে ভেপকো এসি বাসে চড়ার অভ্যাস, কিন্তু কখনো মানিব্যাগ খোয়া যায়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে পকেটমারকে হাতে নাতে ধরে ধোলাই দেয়ার রেকর্ড আমার আছে। এই যেমন, সেদিন বঙ্গবাজার থেকে জার্মান যাত্রার শপিং শেষে ফেরার পথে গুলিস্তান-মিরপুর রুটের বাসে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ প্রেসক্লাব-হাইকোর্ট মোড়ে কালো ছোকড়াটা যখন হাতের আঙুলে পরখ করার চেষ্টা করছিলো আমার ব্যাক পকেটে কি আছে, তখন নিমিষেই আমি ছেলেটার গালে কষে চড় মেরেছিলাম, সেটা কি খুব স্বাভাবিক কোনো ঘটনা? ঢাকা শহরের সচেতন সেই আমি কীভাবে জার্মান এসে ধরা খেলাম, রাগে ক্ষোভে দু:খে আমার ইচ্ছে করছিলো - কচু গাছের সাথে ফাঁসি দিয়ে সুইসাইড খাই। আশেপাশে কচুগাছ দেখতে পেলাম না। ভাবছিলাম, অন্তত: একটা নদী থাকলে পাশে গিয়ে জলকে চলা তরুণীর কোমর থেকে কলসি কেড়ে নিয়ে গলার টাইয়ের সাথে বেঁধে নদীতে গিয়ে ঝাপ দিতাম। প্রেমের মরা না হওয়ায় আমি নিমিষেই জলে ডুবে যেতাম।

এরকম হতাশ ভাবনায় হঠাৎ দুটো আশার আলো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। মনে পড়লো, আমার দোস্ত মকসুদালি আমাকে শার্টের বুক পকেটে কিছু ডলার রাখতে বলেছিল। তার কথামতো সামান্য কিছু ডলারও সেখানে রেখেছিলাম। শার্টের পকেট থেকে ডলারগুলো বের করে হাতের ঘামে ভেজা তালুতে শেষ সম্বলের মতো ধরে রেখেছি তখন হঠাৎ রাইন নদীর কথা মনে পড়লো। এবং এও মনে পড়লো যে, রাইন নদীর আশেপাশে মাসকাওয়াথ ভাই থাকেন।

জার্মানি যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যার কথা প্রথম মনে পড়েছিল তিনি মাসকাওয়াথ ভাই। কারণ, ঐ বরফের দেশে আমার চেনাজানা আর কেউ নেই। ভাবলাম, মাসকাওয়াথ ভাইয়ের বাসায় যাই। হাতে পায়ে ধরে দুটা দিন উনার বাসায় থাকি। সমস্যা হলো - উনার ঠিকানা জানি না। বন নাকি কোলোন শহরে উনার আবাস এতটুকুই কেবল জানি। ভেবেচিন্তে গেলাম, মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টারে। ডলার গুলো দিয়ে বললাম, ডয়েস মার্ক দাও। কাউন্টারের তরুণীটি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 'জেল থেকে ছাড়া পেলে কবে?'
আমি তো ভীষণ অবাক।
'জেলে ছিলাম কবে?'
হাসি দিয়ে তরুণী বললো - ডয়েস মার্কের বদলে অনেক আগে জার্মানীতে ইউরো চালু হয়েছে। তার ধারণা, ততদিন আমি বোধ হয় জেলেই ছিলাম, তাই এরকম বিশ্ব কাঁপানো খবর জানি না।
ডলারের বদলে পনেরো ইউরো হাতে নিয়ে সুবোধ বালকের মতো তরুণীর ধারালো থুতনিতে আমার চোখ দুটো বিসর্জন দিলাম, বললাম চলমান বিপদের কথা। কোলোন কিংবা বন শহরের কথা বলতেই পরামর্শ দিলো, মোড়ের স্টপেজ থেকে বাস ছাড়ে, বাসে করে খুব আরামে তেরো ইউরো দিয়ে ঐ শহরে যেতে পারবো।

বাস যাত্রা শুরু হলো। জানালা দিয়ে ইউরোপের আকাশ দেখি। রাস্তা দেখি। কিছু পড়তে পারি না। সব বিদঘুটে নাম। একটু আগে যেমন ডাসেলডর্প-বন-কোলোন নামগুলো বললাম, ওগুলো ঠিক হলো কিনা আমি নিশ্চিত না। মনের ভেতর টেনশন। হাতে মাত্র দুই ইউরো। যাক, বন শহরে গিয়ে নামলাম। মাসকাওয়াথ ভাইয়ের খোঁজ করি। মনে পড়ে - ইমেইলের নিচে উনার ঠিকানা ফোন নম্বর লেখা থাকতো। কিন্তু আমি মেইল চেক করি কোথায়? এখানে কি ঢাকার মতো সাইবার ক্যাফে আছে? আর আমার হাতে দুই ইউরো, এটা দিয়ে মেইল চেক করা যাবে? এরকম হাজারো চিন্তায় ঠিক করলাম দেশী ভাই খোঁজ করবো। বাংলাদেশের কাউকে পেলে মাসকাওয়াথ ভাইয়ের ঠিকানা নেবো। বেগতিক হলে দেশী ভাইয়ের কাছেও আশ্রয় চেয়ে বসবো। সমস্যা হলো, আমার ইংরেজি বলার যে ছিরি, তাতে কেউ বুঝে না আমি কি বলি, কি চাই। শেষে এক লালবুড়ি বললো, সামনের তিনটা মোড় পরে এক বাংলাদেশী ছেলের অফিস আছে। - - - খুঁজে খুঁজে বের করলাম। দরজায় বাংলাদেশের বিশাল লাল সবুজ পতাকা। আমার ইচ্ছে করছিল, ঐ পতাকায় মাথা ঠুকে কাঁদি কিছুক্ষণ। কোন কুক্ষণে প্রাণ কোলা খেলাম, কেনোই বা জার্মানি আসার টিকিট পেলাম, কেনোই বা মানিব্যাগ হারালাম। চোখ দুটো তখন ভিজে উঠে।
দরজা খুলে ঢুকলাম। দেখি এক ভদ্রলোক, বয়েস ২৭/২৮ হবে (পরে দেখেছি উনি মানুষকে নিজের বয়েস ২৩ বলেন, ওটা দেশের প্রথম সারির এক দৈনিকেও ছাপা হয়েছে) কম্পিউটারে কাজ করছেন। আমি বললাম - এক্সকিউজ মি!
ভদ্রলোক আমার দিকে ফিরে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন - 'বাংলা কইতে পারেন না?'
আমি তো পুরা টাসকি।
এবার চোখ গোল গোল করে বললেন - 'কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, হাতের কাজটা শেষ করে নিই'।
আমি চেয়ারে বসে থাকি।
দেখি - দেয়ালে দুটো বড় পোস্টার। ইংরেজিতে লেখা। শিরোনাম - আমি ভালোবাসি, আমি ঘৃণা করি। এক পোস্টারে লেখা আছে - "আমি ভালোবাসি সংখ্যায় কম কিন্তু ভীষণ স্মার্ট ছিনতাইকারীদের। এবং ঘৃণা করি বাংলাদেশের সেইসব বীর জনতাকে যারা এ সন্ত্রাস ঠেকাতে পারে না।"
অন্য পোস্টারে লেখা আছে - "ঈশ্বর প্রদত্ত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসি, সাদা দিলের ঐসব লোকদের ভালোবাসি যারা মিথ্যা বলে না, প্রতারণা করে না। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও আমার চিরসবুজ দেশকে ভালোবাসি। আর ঘৃণা করি বাংলাদেশের কুৎসিত রাজনীতিকে। যারা আড়ালে প্রতারণা করে এবং আমার চোখে ধরা পড়ে আমি তাদেরও ঘৃনা করি।"
আমি এসব কঠিন কঠিন কথার মাজেজা বুঝি না। কেবল তাকিয়ে থাকি।
তখন ভদ্রলোক, চেয়ার থেকে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন - 'ওগুলো কি পড়েন? ঐ বাণীগুলো আমি দিয়েছিলাম ২০০০ সালের নভেম্বর ডিসেম্বরের দিকে।'
আমি চুপ থাকি।
এরপর ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করেন। বলেন, আমার নাম ধুসর। ধুসর গোধুলি।
আমি তো অবাক।
মানুষের নাম ধুসর গোধুলি কিভাবে হয়?
আমি নিজের নাম জানিয়ে, বিনয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - ধুসর গোধুলি কারো নাম হয় নাকি?
ভদ্রলোক দেখি মহাক্ষ্যাপা - 'আমার নাম ধুসর গোধুলি হলে আপনার কোনো সমস্যা আছে?'
আমি বললাম - না, আমার সমস্যা কি? মনে মনে ভাবলাম - গ্রাম দেশের সকিনা আক্তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে নিজেকে 'সাকিন' পরিচয় দেয়ার ঘটনার সাথে আমার পরিচয় আছে। সেখানে বাংলাদেশের নায়ক শাকিব খানের মতো হেয়ার স্টাইল নিয়ে কেউ ধুসর গোধুলি হয়ে গেলে আমার কি!
যাক।
ধুসর আমাকে বললো - ' জ্বী বলুন, এই গোলাম আপনার জন্য কি করতে পারে?'
আমি বিব্রত হই - 'ছি: ছি: এভাবে কথা বলছেন কেনো!'
- না, মানে আমার দরবারে আপনি পদধুলি দিয়েছেন। আপনার সেবা করা তো আমারই দায়িত্ব।
তারপর সেই রূপকথার বনবাসী রাজপুত্রের মতো আমার ভাগ্যদোষের কথা গল্প করি। ধুসর হতভাগা রাজপুত্রের সামনে ঐশ্বরিক দরবেশ।
সব ঘটনা জানিয়ে বললাম, আপনার কম্পিউটারে আমি কি ই-মেলটা চেক করতে পারি?
আমাকে চমকে দিয়ে ধুসর বললো - 'আপনার শালী আছে?'
হঠাৎ এ প্রশ্ন কেনো - জিজ্ঞেস করতে পারতাম। বরং সরাসরিই বললাম - 'জ্বি না, শালী নেই'। (বিয়েই তো করিনি। শালী আসবে কোত্থেকে!!!)
এবার ধুসর গেলো বিগড়ে - 'নাহ! তাহলে তো আপনি আমার কম্পিউটার ইউজ করতে পারবেন না। যাদের শালী নেই, তারা আমার কম্পিউটারে হাতও দিতে পারে না'।
আমি ভাবি - এ কোন দেশে এসে কার পাল্লায় পড়লাম? কম্পিউটার চালানোর সাথে শালীর কি সম্পর্ক!
দু'মিনিট চুপচাপ বসে থাকি। নাহ! সহজভাবে হবে না। চালাকী করতে হবে। বললাম - 'দেখেন, টিকিট ফ্রি পেয়েছিলাম একটা। তাই একাই এসেছি। ক্ষমতা থাকলে তো শালীকে নিয়েই আসতাম!'
শুনে ধুসর যেনো শুন্যে লাফিয়ে উঠে - 'মানে আপনার শালী আছে'?
আমি বলি - জ্বি আছে। অবশ্যই আছে।
- আরে মিয়া, সাথে আনার কথা জিজ্ঞেস করছি নাকি। দেশে আছে তো?
আমি বলি – ঠিক, দেশে আছে।
- নাম কি?
- রুমা।
- বাহ, খুব সুন্দর নাম। কিসে পড়ে?
- ক্লাস নাইনে, আর্টসে। [মনে মনে ভাবি, দুর্বলতা পাওয়া গেছে!!!]
- ‘ক্লাস নাইন তো বেশী ছোটো হয়ে যায়। যান ভাই, বাইরান, আমার কম্পিউটারে আপনি হাতও দিতে পারবেন না’।
আমি হাল ছাড়ি না। আরেকটা টোপ দিই - আপনাকে রুমার বড় বোন সোমার কথা তো বলা হয়নি।
ধুসর এবার কপাল ভাঁজ করে - সোমা আপনার শালী? কি করে?
- অনার্সে পড়ে। সেকেন্ড ইয়ার।
- দেখতে কেমন?
- মাশাআল্লাহ।
ধুসরের চেহারায় এবার আলোর ঝিলিক মারে - 'ধুররো ভাই। আপনারে শুধু শুধু তাড়াইতে চাইলাম। যান, কম্পু চালান, মেইল চেক করেন'।
আমি ইয়াহু মেইল চেক করি। সার্চ মারি। মাসকাওয়াথ ভাইয়ের কোনো মেইল নাই। অদ্ভুত ব্যাপার। উনার কমপক্ষে তিনটা মেইল ছিল আমার ইনবক্সে, ছয় সাত মাস আগেই তো যোগাযোগ হলো। মনে পড়লো, মাসকাওয়াথ মেইল করতেন আরেক একাউন্টে ওটা আমি তেমন চেক করি না। খুলে দেখলাম একাউন্ট এক্সপায়ার্ড। মানে সব মেইল মুছে গেছে! এজন্যই বলে - বিপদ আসলে চারদিক থেকেই আসে। কম্পিউটার থেকে সরে এসে ধুসরকে মাসকাওয়াথ ভাইয়ের কথা বললাম। ধুসর তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলো। মাসকাওয়াথ ভাই নাকি ভীষণ ব্যস্ত। দেখা করাও ঝামেলা। এবার ধুসর আমার হাত চেপে ধরে - 'ভাই ক্ষমা করে দিয়েন। আপনার সাথে প্রথমে ভালো ব্যবহার করি নাই। মন মেজাজ সব সময় ভালো থাকে না'।
আমি বললাম - না না। ক্ষমা চাইবার কি আছে। আমিই তো বরং উটকো ঝামেলা করছি।
ধুসর এবার বিনয়ী হয়ে পড়ে - তাহলে যে দু'চারটা দিন জার্মানী থাকবেন, এই গরীবখানায় থাকবেন, কথা দেন।
আমি বললাম - এটা তো আমার জন্য বিরাট সৌভাগ্য।

বিকালে কিছু খেলাম না। সন্ধ্যার দিকে ধুসর বললো - আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। আপনি বাসায় থাকেন। কম্পিউটারে ব্রাউজিং করেন। আমি ফিরে আসবো তাড়াতাড়ি।
আমি বলি, ভাইরে আমি তো কিছু চিনি না। আমারে ফেলে কই যান?
ধুসর এবার ধমক দেয় - হোই মিয়া! দেশ থেকে একা একা এখানে আসছেন ,আমারে খুঁজে বাইর করছেন ডরান নাই, আর এখন একা একা ঘরে থাকতে ডরান কেন?
আমি চুপ মেরে যাই। পেটের ভেতর তখন ইটের ভাটার আগুন। লজ্জায় খাবারও চাইতে পারি না। জানলাম - এক বঙ্গললনা গত সপ্তায় বনে এসেছে চাকরি করতে। এন্টি-হোমসিকনেস ৫০০ মিলিগ্রামের টোটকা নিয়ে ধুসর যাচ্ছে তার বাসায়। কান্না ভেজা মুখে হাসি ফুটিয়েই বাসায় ফিরবে। ধুসর নাকি প্রায়ই এসব করে, যেখানেই দেশের মানুষ বিপদে ওখানেই ধুসরের রঙীন পদচারনা।
আমি ইন্টারনেটে ঘুরি। ধুসর দেখলাম একটা ব্লগসাইটকে হোমপেজ করে রেখেছে। পাতা উলটে দেখলাম, সেখানে ধুসর নিজেও লিখে, ধুসর গোধুলি নামে। ঐ ব্লগ সাইটে ঘুরে ঘুরে আমার ভালোই সময় কাটলো। ঘন্টা দুয়েক পরে ধুসর ফিরে এলো। হাতে ম্যাকডোনাল্ডের বিগ ম্যাক।
আহারে, মার্কেটিং বইয়ে কতোই না পড়েছি ম্যাকডোনাল্ডসের কথা। প্ল্যান ছিলো - জার্মানি নেমেই ম্যাকবার্গার খাবো। তখন আমার আবার মানিব্যাগ হারানোর শোক উথলে উঠে।
ধুসর তাড়া দেয়। আসেন ভাই, গরম গরম খেয়ে নিই। ঠান্ডা হলে মজা পাবেন না।
খেতে বসে ধুসর জিজ্ঞেস করে - সোমার কথা বলছিলেন আপনি। সোমা পড়ে কিসে?
আমার ভীষণ হাসি পায়। হাসি চাপতে গিয়ে মনে হয় বার্গার নাকে উঠে যাবে। হাসি আড়াল করতে গপাগপ কামড় দিয়ে মুখে বার্গার পুরে দিই।
ধুসর খেয়াল করে - ঐ ভাই! আস্তে ধীরে খান। গলায় আঁটকে মারা গেলে আমি খুনের দায়ে ফাঁসি চড়বো।
আমি মুখে কোক ঢেলে সোমার গল্প শুরু করি।
এই ফাঁকে গল্পের প্লট রেডি হয়ে গেছে।
- সোমা জাহাঙ্গীরনগরে পড়ে, ইকনোমিক্সে। সেকেন্ড ইয়ার।
- আজকালকার ছেলেমেয়েরা তো মর্ডান। নিজেরাই সব ঠিক করে। তো সোমা প্রেম ট্রেম করে নাকি?
আমি চেহারা গম্ভীর করে ফেলি - অসম্ভব! কি যে বলেন? আমার শাশুড়ী ভীষণ কড়া মহিলা। এসব উল্টা পাল্টা কিছু করলে কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।
ধুসরের মুখের হাসি আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। বলে - বিয়ে দিবেন না?
আমি এবার জোশ পেয়ে যাই। দিবো, তাড়াতাড়িই দিবো। আমার শ্বশুর প্রায়ই বলেন ভালো ছেলের খোঁজ করার জন্য।
ধুসর এবার তার প্লেট থেকে এক মুঠো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আমার প্লেটে তুলে দেয়।
আমি নিষেধ করি - আরে করেন কি! সবতো আমাকেই দিয়ে দিলেন, আপনি কি খাবেন?
ধুসর পাত্তা দেয় না - আরে ভাই খান তো। কথা কম বলেন, সারাদিন না খেয়ে ছিলেন সেটা কি আমি বুঝি না।
শুনে আমি লজ্জা পাই।
- তাহলে তো সোমার বিয়ের ব্যাপারে আপনার মতামত খুব ভাইটাল।
- অবশ্যই। আপনি তো এখনো বিয়ে করেননি। করলে বুঝবেন, বড় জামাইয়ের কদরই আলাদা।
এরকম গল্প করতে করতে রাত গভীর হয়। নিজের বিছানা আমাকে ছেড়ে দিয়ে ধুসর সোফায় ঘুমায়। আমি ঘুমানোর আগে সোমা কাহিনীর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই।

পরদিন ইংল্যান্ড-সুইডেন ম্যাচ। আমি প্লেনের টিকিটের সাথে এ ম্যাচের টিকিট ফ্রি পেয়েছিলাম। খেলা হবে কোলোন শহরে। ধুসর জানালো - বন থেকে কোলোন যেতে এক ঘন্টা লাগবে। আমাকে সাহস দিলো, চিন্তার কিছু নাই। সব ধুসরই ব্যবস্থা করবে। জানলাম কোলোন নাকি কার্নিভালের শহর। উৎসব লেগেই থাকে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে আরো বেশী রঙীন। খেলা দেখে কোলোন শহরে ঘুরলাম। ধুসর সব দেখালো। কোলোন ট্রেন স্টেশনের পাশে খালি জায়গায় দেখলাম বিভিন্ন নাটকের রিহার্সাল চলছে। ওখান থেকে ফেরার পথে দেখলাম কেউ গান গেয়ে কেউ ছবি এঁকে ভিক্ষা করছে। পায়ের কাছে পড়ে থাকা কৌটোয় কেউ কেউ খুচরো কয়েন দান করে যাচ্ছে। কোলোন নিউ মার্কেটের মোড়ে কেএফসির সামনে যেতেই দেখি টিশার্ট পড়া এক মুর্তি মানবী। কোনো নড়াচড়া নেই। আরেকটু হলেই ধাক্কা খেতাম। ধুসর টান দিয়ে বলে - 'করেন কি? মান ইজ্জত সব দেখি ডুবাবেন!!' আমি লজ্জা পাই। জানলাম ঐ মেয়েও ভিক্ষা করছে। ধুসর পকেট থেকে ৫০ সেন্ট খয়রাত দিলো। আমি বললাম - কতো টাকা দিলেন? ধুসর বললো - ৪৫টাকা।

সে রাতে আমরা তাজমহলে গেলাম।
তাজমহল একটি রেস্টুরেন্ট।
ধুসরের ডাকে সেলিম ভাই আসলো। ধুসর পরিচয় করিয়ে দিলো, আমি নাকি তার স্পেশাল গেস্ট। কই মাছ ভুনা আর ডাল এলো। আয়েশ করে খাচ্ছি। আমার মনে হলো - আরেকটু খেলে ভালো হতো, পেটে ক্ষিদা ছিলো।
আবার টোপ দিলাম।
- বুঝলেন ধুসর, সোমা খুব ভালো রান্না করে। আমার শাশুড়ীর রান্নার হাতও পাকা। সোমার হাতের রান্না করা ঘন ডাল, রূপচাঁদা মাছ খেলে আপনি জীবনেও ভুলবেন না।
- তাই নাকি?
- হুমম, আপনি নেক্সট ঢাকা গেলে দেখা তো হবেই। তখন আমার বাসায় সোমাকে নিয়ে আসবো শুধু আপনার জন্য রান্না করতে।
- তাহলে তো ভালোই হয়।
ধুসরের চাহনীতে চকচকে ভাব।
'সেলিম ভাই, এদিকে এক প্লেট চিকেন দিয়েন তো' ডাক দিয়ে ধুসর জিজ্ঞেস করে - 'সোমার প্রিয় খাবার কি?'
আমি বুঝি - টোপে কাজ হয়েছে। মুরগীর বিশাল টুকরায় কামড় দিয়ে আমি সোমার কল্পকথা গল্পকথা শুরু করি।
সোমা কি খায়, কি পড়ে এবং পরে, কি শোনে, কোনটা ভালো লাগে কোনটা খারাপ লাগে এইসব।
শেষে ছাড়ি ট্রাম্পকার্ড।
বুঝলেন - সোমার খুব ইচ্ছে বাইরে থাকে এমন ছেলেকে বিয়ে করবে। আমাকে তো প্রায়ই খোঁচা দেয়, 'কী দুলাভাই - এই মরার দেশে থেকে কি আর করবেন? আপুনির কপালে আর সুখ দিলেন কই। আমি নাই। দেশের কোনো ছেলে না, করলে ইউরোপ এমেরিকার ছেলেই বিয়ে করবো।'
ধুসর তখন আইসক্রিমের অর্ডার দিয়েছে। বলে - ' সোমা ইউরোপ এমেরিকার ছেলে বিয়ে করবে মানে বিদেশী ছেলে? আপনারা রাজী হবেন?'
আমি ভুল শোধরাই - 'না না। ফরেন ছেলে না। বাংলাদেশী ছেলে। কিন্তু বাইরে থাকে। এই আপনারই মতো কোনো একজন আর কী!'
আমার এ কথা শুনে ধুসরের মুখ কেমন হয়েছিল তা আপনাদের বলতে পারবো না। কারণ, নিজের পেটফাটা হাসি আঁটকাতে আমি তখন কৃত্রিমভাবে কাশতে কাশতে নিজের হাসি এবং মুখ দুটোই ঢেকেছিলাম।

পরদিন আমার ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে বললাম, ভাই আপনার ব্যাংক একাউন্ট নম্বরটা দেন, আমি এই দুই দিনের খরচ ট্রান্সফার করে দেবো। ধুসর অভিমান করে। বরং আমার হাতে একটা শপিং ব্যাগ ধরিয়ে দেয় - 'সোমার জন্য সামান্য সুভিনিয়র'! আমার কষ্ট হয়, এরকম একজন ভালো মানুষের ইমোশনকে আমি ভীষণভাবে এক্সপ্লয়েট করে গেলাম। আমার গম্ভীর মুখ দেখে ধুসর ভাবে আমি মন খারাপ করছি। হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্না শুরু করে। যতো না আমাকে মিস করা, তার চেয়ে বেশী সোমার জন্য প্রলাপ। পাশ থেকে কে যেনো বলে উঠে - 'দেখছোনি কারবার, দুই আবিয়াইত্যা পোলা পাবলিক প্লেসে করে কি!'
আমি ধুসরকে সান্ত্বনা দিই। দেশে গেলে অবশ্যই দেখা হবে আমার সাথে এবং সোমার সাথে তো অবশ্যই।

নিজের ফোন নাম্বার কাগজে লিখে দিয়ে শেষ মুহুর্তে সোমার বাসার ফোন নম্বর চেয়ে বসলো ধুসর। আমি আর কি করবো। মিরপুর থানার নম্বর মুখস্ত ছিলো, দিলাম ঐটা। দেশে ফিরে এলাম।

দেশে ফিরে আরেক সমস্যা হলো। সে-ই ব্লগ সাইট খুলে নিজের নামে একাউন্ট নিলাম। একদিন ধুসরের সাথে দেখা হয়ে গেলো। বলে - ওপেনলি এতো কথা বলা যাবে না, মেইল এড্রেস দেন। দিলাম। ধুসরের বিশাল মেইল - ভাইরে, দেশে গিয়ে কোনো যোগাযোগই করলেন না! সোমার বাসায় ৪/৫বার ফোন করলাম, আপনার শ্বশুর ফোন ধরেই ধমক দেয়, বলে - এটা নাকি মিরপুর থানা। সোমা কেমন আছে, কি করছে।

আমি জবাব দিলাম - 'ভাই ধুসর, আপনাকে কি বলবো জানি না। সে এক বিরাট ইতিহাস। আমি জার্মানী থেকে এসে জানি, সোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, RAB এর বড় অফিসার। গত সপ্তায় বিয়ে হয়ে গেছে। আমি জানি আপনি মনে কষ্ট পাবেন, তাই জানাইনি। আপনার মতো বিশাল হৃদয়ের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া অনেক ভাগ্যের ব্যপার। যদি কখনো আপনার জন্য কিছু করতে পারি, তবে আমার জার্মান ভ্রমণের ঋণগুলো সামান্য হলেও শোধ হবে।'

আবার ধুসরের মেইল পেলাম - 'সোমা সুখে থাকুক, বড় ভাই হিসেবে এ শুভকামনা জানাই। রুমা কেমন আছে জানাবেন, ওকে আমার শুভেচ্ছা দিবেন। রুমা কি ইমেইল ইউজ করে? আমার ইমেইল আইডিটা ওকে দিবেন। ফোন নম্বরটা আবারও পাঠালাম, রুমাকে বলবেন - ফোন করতে।'

আমি ভাবলাম, এ কোন বিপদ। নিজের বৌয়ের খোঁজ পাই না, কাল্পনিক শালী নিয়ে যন্ত্রণা। তাই চুপ থাকলাম। মেইলের রিপ্লাই করলাম না। ধুসরও আর মেইল করে না।

পরিচিতদের বার্থ ডে ক্যালেন্ডার উল্টাতে গিয়ে দেখি আজ ১২ আগস্ট।
ধুসর গোধুলির জন্মদিন।
প্রিয় ধুসর, ভার্চুয়াল সম্পর্ক নির্মাণও মাঝে মাঝে বাস্তবকে পরাহত করে। আমার ব্যালকনির ধুসর দেয়ালে রুপোলি রোদ। ঠিক সেরকম রোদের পরশ থাকুক আপনার জীবনে।


পুনশ্চ:
রুমা আজ সকাল থেকে ট্রাই করে যাচ্ছে। ধুসরের ফোন বিজি। ললনাঘট কিংবা ললনাজট যে এর মুল কারণ সেটা অনুমান করতে আমার মোটেও কষ্ট হচ্ছে না।

1 মন্তব্য::

Anonymous,  19 August, 2007  

সুন্দর লিখেছেন। আমার ব্লগ দেখার আমন্ত্রণ রইলো।
http://gmedia.net.ms
ধন্যবাদ।
ওয়াহিদ রুম্মন।

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP