07 August, 2007

অন্যরকম ক্যারিয়ার প্ল্যানিং

মোবাইল স্ক্রীনে আননোন আইডি দেখলে আমি বরাবরই লাফিয়ে উঠি। দূরের কেউ স্মরণ করেছে ভেবে ভালো লাগে। তবে ওভারসীজ কলে মাঝে মাঝে মোবাইলের আসল নম্বরও ভেসে উঠে। এখানেই একটু সমস্যা। বাংলালিংকের নম্বর দেখলে আমার বুক ধড়পড় করে, হাত কাঁপাকাপি করে। চোখে ঝাপসা দেখি। কনফার্ম হয়ে নিই এটা জিরো ওয়ান নাইন ডবল ওয়ান কিনা এবং শেষের ডিজিট দুই কিনা। এরকম কিছু যদি হয়, তবে আমি আস্তে করে মোবাইলটা ড্রয়ারে ফেলে রাখি। বাজতে বাজতে বিরক্ত হয়ে থেমে যায় এক সময়। আরেকটু খোলাসা করে বলি - আমার পরিচিত চারজন মানুষ আছেন যারা বাংলালিংক ব্যবহার করেন, জিরো ওয়ান নাইন ডবল ওয়ান দিয়ে শুরু, এবং শেষে দুই আছে। আমি এদের থেকে পালিয়ে বেড়াই। একজন আমার কাছে একটা স্প্রাইটের বিল পাবেন। দশ টাকার স্প্রাইটের জন্য উনি ফোন করে এই পর্যন্ত দুইশ' টাকা খরচ করেছেন। আরেকজনের একটা বই আমার কাছে আছে। আমি বই ফেরৎ দিই না, উনিও পিঁছু ছাড়েন না। একই প্যাটার্নের ফোন নম্বরের আরেকজনের কাছে আমি ভীষণ ঋণী, অপুরণীয় ঋণ। ফোন রিসিভ দূরে থাক, সামনে দাঁড়াতে পারবো না কখনো। সর্বশেষ জন - এক মিসকলার। নিশিরাতে মিসকল মিসকল খেলতাম। সেসব অন্য গল্প। কিন্তু আজ যেটা হলো -

আজ সকালে মোবাইলে বাংলালিংকের নম্বর থেকে কল। রবিবারের ছুটির দিনে কে এমন স্মরণ করলো? আজকে আবার কী কী সব বন্ধু-বান্ধবী দিবস। ভালো করে দেখলাম, বাংলালিংক নম্বর, শেষে দুই আছে। ততক্ষণে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ খেয়াল করি - জিরো ওয়ান নাইন ওয়ান টু। ফোন রিসিভ করলাম -
- কী রে কি খবর?
- জ্বী, কে বলছিলেন?
- তুই আমাকে চিনলি না? ভুলে গেলি? আমি তোর সিতারা খালা।
এবার আমি স্বাভাবিক হয়ে আসি।
এরকম হাস্কি গলার একজন রমণীকেই চিনি, তিনি সিতারা খালা।
আমাদের আত্মীয় পরিমন্ডলে সিতারা খালা অনন্য এবং অদ্বিতীয়। পাবলিক রিলেশনে তার অসামান্য দক্ষতা। এই যেমন উনি আমার মায়ের আপন বোন না। এমন কি খালাতো, মামাতো, চাচাতো কিংবা ফুফাতো বোনও না। তবুও আমাদের সাথে তার যোগাযোগ, এবং সেটা তার আসা-যাওয়ার কারণেই। কথিত আছে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের একটা টীম গিয়েছিলো সিতারা খালাদের এলাকায়। হঠাৎ ঐ টীমের নায়িকা অসুস্থ হয়ে পড়লো। ক্লাস টেন পড়ুয়া সিতারা খালা নিজে এগিয়ে গেলেন। পাহাড়-নদী কাঁপিয়ে নেচে গেয়ে মাতিয়ে দিলেন। সিনেমার ঐ গান সুপারহিট। নানার পানি-কসমের কারণে সিতারা খালা আর সিনেমায় না নামলেও ঐ নায়ককে আঁচল বন্দী করেছিলেন সহজে। এমন কি আমি যখন ঢাকায় প্রথম এলাম তখন সিতারা খালার বাসায় উঠলাম। উনি গাড়ী করে আমাকে নিউ মার্কেট চেনালেন, আজাদ পার্ক চেনালেন, একবার উইম্পিতেও নিয়ে গেলেন। এরকম নানান কারণে সিতারা খালার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সময় অসময়ে ডাকলেও আমি ছুটে যেতাম। একবার উনাদের টয়লেটের পাইপে কি যেন সমস্যা হলো, বাসায় অনেক গেস্ট - সেবার রাইনখোলা থেকে 'ময়লা কাজের জন্য সিরাজ সুইপার'কে আমিই কালো ক্যাবে করে বনানী নিয়ে গিয়েছিলাম। হুমায়ূন আহমেদের হিমুরও একজন সিতারা খালা আছে, যার সাথে আমি প্রায়ই আমার সিতারা খালার মিল খুঁজে পেতাম। একবার 'এবং হিমু' পড়তে দিয়েছিলাম, খালা বই পড়ে আমাকে ফোন করে বললেন - আমি যেন জীবনেও তার বাসায় না যাই। তার ধারণা - খালার গল্প আমি মানুষের কাছে করেছি, কোনো না কোনো ভাবে ওটা হুমায়ূনের কানে পৌঁছে গেছে। নইলে - খালা যে খালুকে স্যান্ডেল পেটা করলেন ওটা বইতে আসবে কীভাবে? সেই অপরাধে অপরাধী হয়ে রইলাম, কোনো যোগাযোগ নেই। আজ হঠাৎ ফোন। বললাম
- খালা, তুমি এতদিন পর! আমার ফোন নম্বর পেলে কোথায়?
খালা এবার ক্ষেপে গেলেন, খানিকটা আহ্লাদী স্বরে বললেন - তোরা তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছিস, গরীব খালার কথা কি মনে পড়বে?
শুনে আমি বিনয়ে নত হই।
-খালা কি যে বলো। বাসায় ফোন করলেই তোমার কথা জিজ্ঞেস করি।
- আচ্ছা শোন, কাজের কথা বলি। থাইল্যান্ডে কারো বাচ্চা হলে কি সিটিজেনশীপ দেয়?
আমি থতমত খাই। সিতারা খালা কি এই বয়সে বাচ্চা নিচ্ছে? জিজ্ঞেস করি - কার বাচ্চা?
- ওহ! তুই জানিস না? শিহাবের বাচ্চা হবে?
শিহাব হলো - সিতারা খালার একমাত্র ছেলে। আমি অবাক হয়ে বলি - শিহাব ভাই পুরুষ মানুষ, উনার বাচ্চা হবে কীভাবে?
- ফোনের বিল বাড়ছে, বেয়াদবী কিংবা ফাজলামী করবি না। খবরদার।
আমি খানিকটা ভয় পাই। স্যান্ডেল পেটা খাওয়া খালুর চেহারা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
- খালা, শিহাব ভাই বিয়ে করলেন কবে?
- তুই তো দেখি কিচ্ছু জানিস না। শিহাব গত বছর সিঙ্গাপুরিয়ান মেয়ে বিয়ে করলো না?
- তাহলে তো ভালোই হলো, উনাদের বাচ্চা সিঙ্গাপুরের সিটিজেন হবে। থাইল্যান্ডের কি দরকার?
- সহজ নারে বাপ। ভেজাল আছে, ঐ বাচ্চা ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরের আর্মীতে কাজ করা লাগবে, তারপরে সিটিজেন হবে। নইলে বাদ।
- হুমম, এইটা তো সমস্যা।
- তুই একটু ব্যাংককের নিয়ম টিয়ম দেখ না। কোনো সিস্টেম করা যায় কিনা।
আমি বললাম, ঠিক আছে খালা - আমি খবর নিচ্ছি। তোমাকে ফোন দিবো।

সিতারা খালার ফোন রেখে আমি পরিচিত কয়েকজনকে ফোন করি। এদের সবাই সন্দেহ করলো - আমি বোধ হয় বাবা হতে চলেছি। দু'একজন এই কু'কামের জন্য আমাকে তিরস্কারও করলো। তাই চুপ মেরে গেলাম, মনে মনে কাল্পনিক উত্তরের খসড়া বানাই। ঘন্টা খানেক পরে সিতারা খালার ফোন
- কোনো খবর পেলি?
- হুমম, খালা। কিন্তু থাইল্যান্ডের নিয়ম তো আরো কড়া।
- কি রকম?
- তুমি হয়তো জানো, গত সেপ্টেম্বরে মিলিটারি ক্যুয়ের পরে সামরিক সরকার ক্ষমতায়।
- জানি তো। থাকসিন না টাকসিন ও ক্ষমতা হারালো - - -
সিতারা খালার বিসিএস নলেজ দেখে আমি মুগ্ধ। বললাম
- এই সামরিক সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশী কারো বাচ্চা এ দেশে হলে ৪০ দিন বয়সে মিলিটারীর হাতে তুলে দিতে হবে। ওরা সেনা ছাউনিতে ঐ বাচ্চাকে বড় করবে। আঠারো বছর পূর্ণ হলে সিটিজেনশীপ পাবে। তারপর এদের সেনাবাহিনীতে কাজ করে জীবন চালাতে হবে।
- বলিস কি?
- হুমম, এটাই তো শুনলাম।
- কি ভয়ংকর ব্যাপার। সেনা ছাউনিতে বাচ্চা পালা যায় নাকি?
- কি করবো খালা? যে দেশের যে নিয়ম।

খালা এবার দমে যান।
বলেন - তোর ই-মেল এড্রেস কি এখনো ঐ বিদঘুটে টুফোরফোরওয়ানওয়ানথ্রিনাইনঅলাটা আছে?
- হ্যাঁ, ওটাই আছে। কিন্তু তুমি জানলে কীভাবে?
- খালাকে তো তোরা পর মনে করিস। জানিস, তোদের আমি কতো আপন মনে করি।
আমি বললাম - খালা, তুমি কি ইন্টারনেট ইউজ করো?
- কেনো? আমি কী ব্যাকডেটেড মানুষ?
- না, খালা। তা বলছি না। তোমার ই-মেল আইডি কি?
- লিখে নে, সিটারা, শেষে এ কিন্তু দুইটা, সিক্সটিন এট জিমেইল ডট কম।
আমি লিখে জিজ্ঞেস করি, খালা - তোমার নামের শেষে সিক্সটিন কেনো? তোমার বয়স কি ষোলো?
- তুই আবার ফাজলামী করছিস? সিক্সটিন আমার বয়েস হবে কেনো? ওটা তো আমার বাসার নম্বর।
- আচ্ছা।
খালা এবার খুকখুক করে কেশে বলেন - ভালো কথা মনে পড়লো, তোর অর্কুটে ফ্রেন্ড লিস্টে এতো মেয়ে আসলো কোত্থেকে?
আমি এবার আসমান থেকে পড়লাম।
- খালা, তুমি আমার অর্কুটও দেখে ফেলেছো?
- আগে বল, ঐ মেয়েগুলা কে?
- খালা, কোন মেয়ের কথা বলছো?
- শোন, বেশি বিটলামি করবি না। দেশের বাইরে গিয়ে ডানা গজাইছে? ঐ যে দেশপান্ডে না কি একটা ইন্ডিয়ান মেয়ে, ঐটা কে?
এবার আমি হাসি - সমস্যা কি খালা?
- সমস্যা নেই মানে। ভিনদেশী একটা ম্যারিড মেয়ের সাথে তোর সম্পর্ক হবে কেনো?
- খালা, তুমি সম্পর্ক খুঁজতে যাচ্ছো কেনো?
- বয়েস তো কম হলো না। কালে কালে কতো কিছু দেখলাম। ঠিক করে বল, ঐ মেয়ের সাথে তোর কি?
- খালা শোনো। তুমি না মর্ডান মেয়ে। তোমার মনে আছে, খালুকে তুমি কিভাবে বিয়ে করেছিলে? তাও তিরিশ বছর আগে - - -
- মর্ডান বলেই তো শেয়ার করি। প্রেম ট্রেম করতে পারিস। কিন্তু ভিনদেশী, ভিন ধর্মের ম্যারিড মেয়ের সাথে কিছু করে কোন ফাঁদে পড়িস, ঐটাই ভয় লাগে।
- হা হা। খালা, টেনশন করো না।
- সাবধান করে দিলাম। আমি কিন্তু তোর মায়ের কাছে নালিশ দিবো।
- আমি জানি, তুমি এটা করবে না।
- কেনো? করবো না কেনো?
- হা হা। আমি তাইলে সাত্তার মামার সাথে তোমার কৈশোর প্রেমের ঘটনাটা আমার ব্লগে লিখে দিবো?
- খবরদার বললাম, আমার ইমোশন নিয়ে ধমক দিবি না।
বোঝলাম, অসুদে কাজ হয়েছে।
- ওকে খালা লিখবো না। তুমি যদি চাও আমাদের ব্লগে জয়েন করতে পারো।
- কোথায় জয়েন করবো?
- ব্লগে। ব্লগ।
- ব্লগ কি?
- এটা অনেকটা ফোরামের মতো। বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি হয়।
- ধ্যুত, ঐ বয়স কি আছে? সময়ও কই।
- ওকে, তাইলে মেইল করো।
- ওকে। ভালো থাকিস। আল্লাহ খোদারে একদম ভুলে যাস না। নামাজ রোজা করিস, যা পারিস।
- তুমিও ভালো থেকো খালা।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দিনটি সিতারা খালাময় হয়ে থাকার পর, আমার স্বস্তি লাগে। অনেকদিন পর মনে হলো আপন কারো সাথে প্রাণ খুলে কথা বললাম। দুপুরে খেয়ে এসে একটু আগে মেইল চেক করতে গিয়ে দেখলাম সিতারা খালার মেইল -

হ্যালো,
আবার একটু জ্বালাই। অনেক ভেবে দেখলাম, তোর খালুর সাথেও কথা বললাম। আমার মনে হয় শিহাবের বাচ্চাটা থাইল্যান্ডের সিটিজেন হলেই ভালো হয়। বুঝিস তো এখন বাচ্চা পালা কতো ঝামেলার কাজ। ওদের আর্মীর কাছে বড় হলে - নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। ঐ বাচ্চা নিশ্চয় প্রফেশনাল হয়ে বেড়ে উঠবে। পরে একসময় দেশে ব্যাক করলে - অনেক বড় পজিশনে জয়েন করতে পারবে। জানিস তো, বন্যা যেমন আসে সেরকম - আমাদের দেশে ভবিষ্যতেও সেনা শাসন আসবেই বছর ঘুরে। ক্যারিয়ার প্ল্যানটা আগে থেকে করাই ভালো। শিহাবও বললো - থাইল্যান্ড ভালো অপশন। তুই একটু লিগ্যাল ব্যাপারগুলো ডিটেইল জানা, এই সপ্তাহর মধ্যেই। আমি পরে ফোন করবো।
- তোর সিতারা খালা।

খালার মেইল পড়ে আমি কিছুক্ষণ চুপ মেরে রইলাম।
আরো একটি বাংলালিংক নম্বর ব্ল্যাক লিস্টেড হলো।

3 মন্তব্য::

মধুশ্রী 07 August, 2007  

প্রথমে আদাব ও নমস্কার জানাই।
আমার লেখা আপনার ভালো লেগেছে জেনে, খুব খুশি হয়েছি। আপনাকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
আপনার লেখা পড়েছি। এই ব্লগে এবং সচলায়তনে।
খুব সুন্দর, প্রাণবন্ত লেখা।
শুভেচ্ছা নেবেন।

Anonymous,  16 August, 2007  

শিমুল ভাই
সাদার ওপরে কালো ছোট ছোট ফন্ট! চোখ ব্যাথা গেছে। সেটা অবশ্য টের পেলাম লেখাটা পড়ে শেষ করার পর। একটানে মুগ্ধ হয়ে পড়ে গেলাম। ছোট একটা ঘটনাকে কতো সুন্দর বর্ননায় লেখে দিয়েছেন!
আপনি সিরিয়াসলি লেখালেখি শুরু করলে আজ থেকে পাচ-দশ বছর পর হয়তো গর্ব করে বলতে পারবো ওই যে দেশের জনপ্রিয় লেখক আনোয়ার সাদাত শিমুল আছে না, উনি আমার পরিচিত :)
আপনার লেখার সাবলীল দিকটা আমি কেন সবাইকে টানতে বাধ্য। অসাধারন !
ও আরেকটা কথা -সিতারা খালার এই ঘটনাটার আপডেট দিয়েন :)
আপন তারিক, ঢাকা

আলী মাহমেদ 18 August, 2007  

আমি নিজেই নিজেকে ধন্যবাদ দেই- আমার বাংলালিংক নাম্বার নাই!

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP