12 July, 2007

স্বপ্নপূরণ

আরমান বারবার মোবাইলে রিং করে যাচ্ছে। রিং হচ্ছে কিন্তু রোমানা রিসিভ করছে না। খানিকটা টেনশন হয়। আবার মেজাজও চড়ে উঠে। মানুষ এমন কেয়ারলেস হয়! রোমানা হয়তো এখন শপিংয়ে কিংবা মায়ের বাসায়। ব্যাগে মোবাইল বেজে চলেছে অবিরাম। সেদিকে রোমানার খেয়াল নেই। সে হয়তো গুলশান মার্কেটে হোলসেল শপে রেভলন - গার্নেয়ার - সিট্রাখুঁজে বেড়াচ্ছে অথবা স্কুল জীবনের বান্ধবীদের সাথে বাস্কিন এন্ড রবিন্সে আইসক্রীম খাচ্ছে! মোবাইলের রিং সে শুনতেই পাচ্ছে না। শেষে দেখা যাবে - টুয়েন্টি মিসড কল। তেমন সিরিয়াস কিছু না - কাজের ফাঁকে 'কী করছো' টাইপ টুকটাক কথা বলার জন্যই আরমানের ফোন করা।

দুই.
আরমানের প্ল্যান ছিল আজ সন্ধ্যায় আট্রিয়ামে ডিনার করবে। ওদের ব্যুফে ডিনারটা খুব ভালো। তাই একটু আগে আগে বাসায় এলো। রোমানা বাসায় নেই। ফোন করে জানা গেল - স্কুল ফ্রেন্ড সোমার ননদের গায়ে হলুদ, ওখানে গেছে। আসতে রাত হবে। আরমান ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। রোমানা কোথায় যাবে, কী করবে - এসব আরমানকে জানানোর একটুও প্রয়োজন নেই! আরমান হয়তো 'না' করতো না, কিন্তু খানিকটা নিশ্চিত তো থাকতে পারতো - রোমানা নিরাপদে আছে, ভালো আছে। পাশাপাশি এরকম সারপ্রাইজিং প্ল্যান করে হতাশ হতে হতো না। ব্যালকনিতে বসে আরমান ভাবে -বুঝি মা-বাবাদের সময়টাই ভালো ছিল। বাবার পছন্দের খাবার বানিয়ে বিকেলে পাশে বসে মা হাতপাখার বাতাস করতো। এটা সেটা নানান কথার ফাঁকে মা বলতো - 'ভাবছিলাম আরমানকে নিয়ে ক'দিন নিশাখালী থেকে ঘুরে আসি'। শুনে বাবা চা'য়ে চুমুক দিয়ে আস্তেকরে মাথা নাড়তেন - 'যা-ও। সপ্তাহখানেক ঘুরে এসো'। মা তখন উচ্ছ্বাস লুকাতে শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতো। ওদিকে আরমান নানাবাড়ী যাবার আনন্দে দিশেহারা।
ভাবনায় শৈশব কৈশোর ফিরে আসে। সময় ফিরে আসে না। সময়গুলো পাল্টে যায় ক্যামন করে, মানুষগুলোও!

তিন.
আরো কিছু সময় গেল মাঝে।
মোনার জন্ম হলো।
কিছুদিন উৎসব হলো, সবাই এলো গেলো।
---যেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক।

চার.
ছোটখাটো এয়ারকন্ডিশনড রূমটায় তখন যেন শ্মশান বাড়ীর নীরবতা। চশমার কাঁচ পরিষ্কার করে আবার চোখে লাগালেন ডা. অজিত, অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে এমআরআই ফিল্মের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। নতুন ফিল্মের সাথে পুরনোগুলো মেলালেন। হাতের রিপোর্ট আবার পড়লেন। তারপর খনিক ভেবে জিজ্ঞেস করলেন - 'প্রেগন্যান্সির তখন কতো মাস চলছিল?'
- 'পাঁচ মাস'। আরমান দ্রুত জবাব দেয়।
- 'সাড়ে পাঁচ মাস'। পাশ থেকে শুধরে দেয় রোমানা।
ডা. অজিত এবার রোমানার দিকে তাকান, হুইল চেয়ারে বসে একপাশে মাথা কাত করে রোমানা বসে আছে। পাশের চেয়ারে আরমান উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে, টেবিলের উপর হাত রেখে নখ খুঁটছে। সিটি স্ক্যান রিপোর্ট হাতে নিয়ে নীরবতা ভাঙেন ডা. অজিত, রোমানাকে প্রশ্ন করেন
- চিকেন পক্স সারা শরীরে হয়েছিল?
- হুম, তবে মুখে ও মাথায় বেশী।
- জ্বর ছিল?
- হ্যাঁ, খুব জ্বর ছিল। সাথে ঘাঁড়ে ব্যথা।
- সমস্যাটা কী তখন থেকে শুরু?
- তখন এমন ছিল না। কেবল মাঝে মাঝে হাঁটতে গেলে এলোমেলো লাগতো। মনে হতো মাথাটা চক্কর দিচ্ছে, পড়ে যাচ্ছি। এমন লাগতো প্রায় দু'বছর।
- আর ব্যালান্স হারালেন …
- গত তিন মাস।
- আচ্ছা, দেখি - আমার আঙুলটা ধরুন তো, শক্ত করে ধরুন, আরো শক্ত করে। হুম, ঠিক আছে। এবার অন্য হাত দিয়ে ধরুন। শক্ত করে …। আরো জোরে, ওকে।
এবার আরমান কথা বলে - 'পাওয়ার ইজ হান্ড্রেড পার্সেন্ট ওকে'।
ডা. অজিত আরমানের দিকে তাকান - 'দেখুন মিস্টার আরমান, এ কেস নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমার প্রফেসর রিচার্ড নিয়ামের সাথেও মেইলে আলাপ করেছি। মেডিক্যাল টার্মে একে বলে - সেরিবেল্যার আর্টোফি। এটা হলে যা হয় - ব্রেইনের সাইজ ও কম্প্রেশান কমে যায় ধীরে ধীরে। ফলে শরীরের ব্যালান্স থাকে না। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো চিকেন পক্স থেকে এ রোগের শিকার হয় প্রতি চার হাজারে একজন। রোমানা হলেন সেরকম - চার হাজার জনের একজন।'
- 'এর কোন ট্রিটমেন্টনেই?' কাঁপা কাঁপা গলায় রোমানা জিজ্ঞেস করে। গলার শব্দ যেন কোথাও ধাক্কা খাচ্ছে। মনে হচ্ছে রোমানা এক্ষুণি হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পড়বে। বুঝতে পেরে ডা. অজিত সাহস দেয়
- না, না। হতাশ হবেন না, ট্রিটমেন্ট অবশ্যই আছে। গবেষণায় দেখা গেছে - ইনিশিয়াল স্টেজে ট্রিট মোটামুটি ২/৩ মাসেই পেশেন্ট এ রোগ থেকে সেরে উঠে। আমি আশাবাদী, আপনার ব্রেইনের অনেকগুলো কোষ এখনো একটিভ।
মেডিসিন দিয়ে কোষগুলোকে আরো সক্রিয় করা যায়, তবে দরকার - হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি, সাথে ফিজিও থেরাপি।
-'এটা কী বাংলাদেশে সম্ভব?' আরমান জানতে চায়।
-'না, এখনো নেই। ইন্ডিয়ার কোথাও কোথাও আছে, তবে সিংগাপুর অথবা ব্যাংকক নিলে সবচে ভালো হয়।'
আরমান-রোমানা যেন অন্ধকার টানেলের শেষে আলোর দেখা পায়। এখনো সব আশা ফুরিয়ে যায়নি, তবে যত দ্রুত সম্ভব রোমানাকে বিদেশে নিয়ে যেতে হবে - ডা. অজিত অমনটাই বললেন।

পাঁচ.
আরমান খুব দ্রুত খোঁজ-খবর নেয়। ইন্টারনেটে সার্চ করে জানার চেষ্টা করে কোন দেশে কেমন ট্রিটমেন্ট আছে। কোথাও কোথাও ই-মেল, ফ্যাক্স, ফোনও করে। সিদ্ধান্ত নেয় - রোমানাকে সিংগাপুর নিয়ে যাবে। আরমানের আগ্রহের কমতি নেই; সিংগাপুরের ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে মেডিসিন কিনে রেগুলার। খুব দ্রুত সিংগাপুর যেতে হবে, কেবল - রোমানার পাসপোর্ট ভিসার অপেক্ষা। সপ্তাহ দুয়েকের ব্যাপার। তবে এরমাঝে উঠতি ব্যবসায়ী আরমানের জীবনে ঘটে অভাবনীয় এক ঘটনা। এমকে গ্রুপের তিনটি হাইরাইজ ভবন নির্মাণের কন্ট্রাক্ট পায় আরমানের কোম্পানী। আরমান কল্পনাও করেনি এত বড় বিজনেস ডিল পাবে। কন্ট্রাক্টের কাগজপত্র ফাইনাল করতে গিয়ে সিংগাপুর যাওয়া পেছাতে হয়। সে সন্ধ্যায় রোমানার হাত ধরে আরমান বলেছিল - 'প্লিজ রাগ করো না, কন্ট্রাক্টার উপর অনেক কিছু ডিপেন্ড করছে। তোমার চিকিৎসা, আমাদের সচ্ছলতা, মোনার ভবিষ্যৎ - সব।
শুনে রোমানা হেসেছিল - 'তুমি এমনভাবে কথা বলছো যেন অনেক দূরের মানুষ আমরা! হোক না ক'সপ্তাহ দেরী, আমি তো আর মারা যাচ্ছি না।’
আরমান হাত দিয়ে রোমানার মুখ চেপে ধরে - 'ওভাবে বলো না, প্লিজ!'

ছয়.
এর পরের সময়গুলো খুব দ্রুত চলে যায়। কন্ট্রাক্ট ফাইনাল হলো হলো করে দু'মাস। আরমান তখন দারুণ ব্যস্ত। এক মাসের জন্য সিংগাপুর গেলে বিজনেস থমকে যাবে। তবুও রোমানার জন্য যত্ন কমে না। সিংগাপুরের ডাক্তারের সাথে ই-মেলে যোগাযোগ রাখে। অফিস থেকে ফেরার পথে লাজ ফার্মা থেকে রোমানার ঔষধ কিনে। মাঝে মাঝে আল-বাইক থেকে স্যুভ কিংবা ভেলপুরির চটপটি নিয়ে আসে। রোমানা তখন স্টাবল। হুইল চেয়ারে বাসায় থাকে সারাদিন, এটা ওটা রান্না করে, মোনাকে গল্প শোনায়। মাঝে মাঝে আরমান গাড়ি নিয়ে ড্রাইভে বের হয় - সাভার, আশুলিয়া কিংবা বুড়িগঙ্গা। এরকম দিনান্তরে আরমান এক নতুন রোমানাকে আবিষ্কার করে। কেন জানি মনে হয় - এ রোমানাকেই সে খুঁজছিল অনেকদিন। বিয়ের আগে যেরকম লক্ষ্মী-সংসারী বৌয়ের কল্পনা আরমান করেছিল - রোমানা মোটেও সেরকম ছিল না। যখন-তখন শপিংয়ে যাওয়া, কাউকে না জানিয়ে মায়ের বাসায় যাওয়া, বান্ধবীর বাসায় যাওয়া - আরমান পছন্দ করতো না একদম। অথচ অসুস্থ হওয়ার পর, বিশেষ করে হুইল চেয়ার নেয়ার পর রোমানা পাল্টে গেছে বেশ। আরমান পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে - মোনা এখন অনেক বেশী কেয়ার পাচ্ছে, রোমানা হুটহাট করে বাইরে চলে যাচ্ছে না, ঘরে থেকে টুকটাক রান্না করছে। এমন গৃহিনী আচরণ আরমান পছন্দ করে খুব, টের পায় - নিজের অজান্তেই নিজের ভেতর লালন করা একান্ত অনুগত বৌয়ের স্বপ্নটা সত্যি হয়ে এসেছে গত কয়েক মাসে। হেলভেশিয়ার চিকেন ব্রোস্টে গার্লিক সচ মিশিয়ে আলতো করে কামড় দিতে গিয়ে আরমান ভাবে - সিংগাপুর যাওয়াটা আরো পিছালে ক্ষতি কী, আপাতত: খুব জটিল কিছু তো হচ্ছে না। প্রতি রাতে ঘর্মাক্তও হওয়া যাচ্ছে বেশ অনায়াসে। সুতরাং, এভাবেই চলুক আরো কিছুদিন …।

______


অনলাইন ম্যাগাজিন 'বীক্ষণ' জুন ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশ।

1 মন্তব্য::

Abdullah Al Mahbub 17 July, 2007  

শিমুল,
আপনার ব্লগে ঘুরে গেলাম, রেখে গেলাম সামান্য একটু স্মৃতি। আমি আপনার লেখার মুগ্ধ পাঠক, অন্য যেখানে লিখছেন সেগুলো কি এখানেই রাখা যায় না ?! সেটা করলে ভালো হোতো আরো।

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP