05 July, 2007

মনিকা - টাহির এবং ছোট্ট একটি দেশের গল্প

মনিকা পেট্রা প্রথমবার থাইল্যান্ড এসেছিল বছর পনেরো আগে। তখনও ব্যাংককের রাস্তাগুলো এতো প্রশস্ত হয়নি, ফ্লাইওভারগুলো বিস্তৃত হবে শোনা যাচ্ছে কেবল। সেবার শখের বশে বন্ধুর রেস্টুরেন্টে এক সন্ধ্যায় গান গেয়ে মনিকাকে নতুনভাবে ভাবতে হয়েছিল। নিজের কন্ঠশৈলীকে পেশা হিসেবে নেয়ার ভাবনা আগে কখনো আসেনি। থাইল্যান্ডে গান গেয়ে উপার্জনের প্রস্তাবটা হাল্কাচ্ছলে নিলেও জার্মানীর তুলনার স্বল্প খরচে জীবন-যাপন, অনুকূল আবহাওয়া - সব মিলিয়ে 'মন্দ কী' চিন্তাটা মনিকাকে আর দেশে ফেরায়নি। সন্ধ্যায় গান গাওয়ার পাশাপাশি দিনেও কিছু একটা করার চিন্তা জাগে মনে। এখানে ওখানে কাজ করে। বছর কয়েকের মধ্যে নিজে ছোটোখাটো একটা রেস্টুরেন্টও দেয়।


চল্লিশ পেরুনো মনিকার স্থায়ী সংসার করা হয়নি, যেমনটা করা হয় না ইউরোপ-এমেরিকার অনেক মানুষের। ফ্লায়িং বাটারফ্লাই হয়ে ফ্রিডম টু লিভ উপভোগ খুব আহামারী কিছু নয়। সুতরাং, গিভ অ্যান্ড টেকের একঘেঁয়ে ঐ গল্প থাক আপাতত:।

অর্ধ শতক বয়সের কাছে এসে মনিকার সাথে পরিচয় হয় পাকিস্তানি টাহির আহমাডের। টাহির আহমাড ভবঘুরে মানুষ। স্রোতে ভাসতে ভাসতে থাইল্যান্ডে। মনিকার রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে আলাপ জমে। টাহিরের জীবন-কাহিনী মনিকাকে স্পর্শ করে। এক সন্ধ্যায় টাহিরের হু হু কান্নায় মনিকা এলোমেলো হয়ে যায়। পেটান শরীর, শক্ত চোয়ালের এমন সুদর্শন পুরুষ কখন কাঁদে, কেনো কাঁদে? মনিকা টাহিরের কাঁধে হাত রাখে, সান্ত্বনা দেয়। টাহিরের প্রতিক্রিয়া ক্যামন যেনো বেমানান, ঠিক অন্য সব পুরুষের মতো নয়। টাহির যেনো কোনো একটা জায়গায় অন্যরকম। মনিকার মনে হয় এমন নির্বিষ পুরুষের উপর আস্থা রাখা যায় অনায়াসে। ঘনিষ্টতার ধাপগুলো পেরুতে সময় লেগেছে বেশ, কারণ টাহিরের 'আই অ্যাম মুসলিম, ক্যান নট - - -' বারবার বাঁধা দিয়েছে। জীবনে পোড় খাওয়া মনিকার কাছে এ বাধাটা ভালো লেগেছে বেশ। এবং এ ভালো লাগা স্থায়ী হয়েছে পরের বছরে বিয়ে, সংসার, দুজনে রেস্টুরেন্ট চালানো, ইকুয়্যাল শেয়ার। তবুও মাঝে মাঝে অনেক ব্যাপারে মনিকার অসহ্য লেগে উঠে। দুজনে মিলে কাজ করলেও টাহির পর্ক-স্টেক ছোঁবে না, পর্ক পরিবেশন করা থালা-বাসন ধোবে না, পারলে দুই আঙুলে নাক চেপে ধরে। রামাদান এলে টাহির সারাদিন কিছু খায় না। ক্লান্ত থাকে। একটু কাজ করে হাঁফিয়ে উঠে। তখন সব কাজ মনিকাকেই করতে হয়। সন্ধ্যার একটু আগে টাহির কোথায় ব্রেকফাস্ট করতে যায়, ফিরে এসে ঢকঢক কয়েক পেগ। মনিকা জিজ্ঞেস করে - 'ইজ ইট অ্যালাউড ইন ইসলাম'। টাহিরের ব্যাখ্যা - 'রামাদানে সারাদিন কিছু খাওয়া যাবে না, কিন্তু রাতে সমস্যা নেই'। একমাস রামাদানের পর টাহির তিন দিন শরাবে-শরাব ছিল। এটা নাকি রামাদান শেষের সেলিব্রেশন।

মনিকা টের পায়, টাহিরের যে সব সংস্কার দেখে মুগ্ধতা জেগেছিল সেগুলো নিতান্তই মোহ। এবং সে মোহ ভাঙতে খুব বেশী সময় আর লাগবে না। সম্পর্কের এ টানাপড়েন ঘনীভূত হওয়ার আগেই টাহির চম্পট। ব্যাংক একাউন্ট খালি, মনিকার জুয়েলারী বক্স খালি। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সে চড়ে টাহির তখন করাচী। মনিকা আর রেস্টুরেন্ট চালাতে পারেনি। একটা অফিসে পাবলিক রিলেশন অফিসারের চাকরী নিয়েছে।

আরো পরে:একদিন ঐ অফিসে জয়েন করে বাংলাদেশের এক ছেলে। বয়সের হিসেবে মনিকার অর্ধেকেরও কম। মনিকার ভাসাভাসা মনে পড়ে কোথায় যেনো জেনেছিল - বাংলাদেশ পাকিস্তান একসাথে ছিলো কিংবা আছে এখনো। টাহিরের কথা মনে পড়ে। বাংলাদেশের ছেলেটা টাহিরের মতো সুদর্শন নয়, টিপিক্যাল ইন্ডিয়ান চেহারাও নয়। খানিকটা চুপচাপ। মনিকা খুব বেশী কথা আগায় না। বাংলাদেশের ছেলেটা মাঝে মাঝে ফোনে বাংলায় কথা বলে। কিছু শব্দ মনিকার কানে আলপিনের মতো বিঁধে - "আচ্ছা আচ্ছা, জ্বী", টাহিরও বলতো অমন। ক'দিন আগে লবিতে কাকে যেনো 'সেলামালাকুম' বলছিল ছেলেটি। টাহিরও অনেককে ফোনে 'সেলামালাকুম' বলতো। একটা শংকা মনিকার মনে ভর করে। বাংলাদেশী ছেলেটির উপস্থিতি 'আনকমফোর্ট্যাবল' লাগে। মনিকা অফিস থেকে বেরোবার আগে নিজের ড্রয়ার দুবার চেক করে। তেমন কিছু নেই, তবুও 'বর্ন টু রাইড' এর ডিভিডিটা খোয়া গেলে মনিকা নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।

ধীরে ধীরে সময় গড়ায়।

কফি ব্রেকে গল্প হয় কৈশোর পেরোনো ছেলেটার সাথে।

উন্মোচিত হয় টাহির-গল্প।পাকিস্তান প্রসংগ আসতেই মনিকা জানে এক নতুন কাহিনী।সেভেন্টি ওয়ান, সেভেন্টি ওয়ান, সেভেন্টি ওয়ান। মনিকা স্মৃতি হাতড়ায়, কোথায় ছিল সে ঐসময়! পৃথিবীর ছোট্ট একটি দেশে যুদ্ধ হলো, এতো লোক মারা গেলো। মনিকা একদিনও জানলো না?সংখ্যাটা কতো? থ্রি মিলিয়ন?মানে তিন এর সাথে ছয়টা শুন্য বসাতে হবে?ফিফটি টু-তে ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়েও কিলিং? মাই গড!

মনিকা টের পায় - বাংলাদেশের মানুষগুলো ইন্ডিয়ান কিংবা পাকিস্তানীদের থেকে আলাদা। গুগল ঘেঁটে করাপশন, পপুলেশন, পলিটিক্যাল কনফ্লিক্ট কিংবা এক্সট্রিম পোভার্টির পাশাপাশি পাওয়া গেলো এক সংগ্রামী ইতিহাসের কথা। মনিকা খেয়াল করেছে - সেভেন্টি ওয়ানের কথা বলতে গিয়ে সেদিন ছেলেটার চোখ-মুখ কেমন অন্যরকম হয়ে উঠেছিল। এ প্রত্যয়ে তো পলেস্তারা লাগানো কিছু নেই!

ছত্রিশ বছর খুব আহামারি সময় নয়।
ইতিহাসের হাত ধরে বাংলাদেশ এগুবে নিশ্চয়।
_____
সচলায়তনে প্রকাশ (০৫/০৭/২০০৭)

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP