10 October, 2006

বায়েজীদ স্যার

সেই পুরনো কথাগুলো আমাকে আবারো বলতে হয়। একঘেঁয়ে মুখস্ত কথা, ইতিহাস জ্ঞান পরীক্ষার মতো - আনোয়ার সাদাত মিশরের প্রেসিডেন্ট ছিল।
এবার তিনি আমার দিকে আরো একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেন - মারা গিয়েছিল কিভাবে জানো?
- জ্বী স্যার, ৬ অক্টোবর ১৯৮১ সালে - ন্যাশনাল ডে-র প্যারেডে।
- রাইট! হি ওয়াজ গান শ্যুটেড। এনিওয়ে, য়্যূ আর মাই নিউ টিচিং অ্যাসিস্টেন্ট।
এটা ছিল স্যারের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত। ড. আবুল কাশেম বায়েজিদ স্যারের কথা বলছি। সময়টা জানুয়ারী ২০০৩। স্যারের কাজে টুকটাক সাহায্য করি। সাথে চলে মজার সব আলোচনা। ঐ সেমিস্টারে এম.বি.এ ক্লাসে স্যার "ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস" কোর্স পড়াচ্ছিলেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৈষম্যের ব্যাপারে স্যার ছিলেন শোচ্চার। ধনী দেশগুলোর অন্যায্য আচরণের তীব্র সমালোচনা করতেন দারূণ দারূণ সব ধারালো বিশেষণ দিয়ে। বাণিজ্যের পাশাপাশি গ্লোবালাইজেশনের নামে তাদের কালচারাল আগ্রাসনেরও বিপক্ষে ছিলেন তিনি। মনে পড়ে - একদিন কথার মাঝখানে আমি মাসকাওয়াথ আহসানের একটা বই থেকে কোট করে বলছিলাম - সভ্যতার চিমনীর কালো ধোঁয়া আমাদের শরতের আকাশটুকু কেড়ে নিবে। সাথে সাথে স্যার চমকে উঠলেন - চমতকার কথা, অসাধারণ। বইটার দাম কতো?
সাথে সাথে আমাকে টাকা দিলেন বইটি কেনার জন্য।
পরদিন কিনে আনলাম।
শুনেছি অ্যামেরিকায় যখন ছিলেন তখন তাঁর গাড়িতে একটা ছোটখাটো লাইব্রেরী ছিল।
এরপর ঈদের ছুটি ছিল। ঈদের পর ক্যাম্পাসে এসে শুনি স্যার অসুস্থ। একদিন খবর পেলাম বাংলাদেশ মেডিক্যালে আছেন। অথচ বেড নাম্বার কেউ জানে না। তবুও গেলাম বাংলাদেশ মেডিক্যালে। রোস্টার চেক করে দেখি - এই নামে কোন রোগী নেই। একজন পরামর্শ দিলো - ’সবগুলো ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। রোস্টারে সব থাকে না’। এরপর শুরু হয় আমার হসপিটাল চককর। ৫০/৬০জন রোগীর চেহারা চেক করি, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত সবাই, কিন্তু স্যার নেই। ঘন্টা তিনেক ঘুরেও বায়েজিদ স্যারকে পেলাম না। পরের সপ্তায় জানলাম - স্যার নাকি পিজি হসপিটালে আছেন। এবার বেড নাম্বার কালেক্ট করি। গিয়ে দেখি - ঐ বেডে অন্য মানুষ শোয়া। কথা না বলে চলে এলাম। আবার সেই একই চক্র। রোস্টার চেক করা। অনেক অনুনয় বিনয়। শেষে দেখা গেলো - বেড নাম্বার ঠিক আছে। কাছে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করলাম - এ তো বায়েজিদ স্যারই! শরীর সাংঘাতিক ভেঙে গেছে। শেভ না করায় মুখে লম্বা দাড়ি। চেনার উপায় নেই। কিছুক্ষণ কথা বললাম। স্যারের ’বোন ক্যান্সার’ ধরা পড়েছে। নিজের বয়স ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সত্বেও বললাম - ’মনে সাহস রাখেন স্যার, আপনি ভালো হয়ে যাবেন’।
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন - ’তুমি আমাকে সান্তনা দিচ্ছো? ’
সে সন্ধ্যায় খুব মন খারাপ নিয়ে পিজি হসপিটালের বাইরে এলাম। দিনটা মনে থাকবে অন্য আরেকটা কারণে - সেদিনই বুশ ইরাক আক্রমণ শুরু করে। সপ্তাহ খানেক পর আবার পিজি হসপিটালে গিয়েছিলাম - স্যারকে দেখতে। সেদিন দেখলাম স্যার খুব আশাবাদী, সুস্থ হয়ে উঠবেন। বললেন - তুমি যে বইটা কিনেছিলে ওখানে একটা শব্দ আছে - ’লোলিতলোভনকান্তি’। আমরা সবাই এখানেই আঁটকে আছি...।
স্যারের চিকিতসা সাহায্যার্থে ছাত্রেরা একটি কনসার্টও আয়োজন করেছিল। সবাই কামনা করছিলেন - স্যার ফিরে আসুক!
পরের সেমিস্টারে সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্যার ক্যাম্পাসে ফিরলেন। ভীষণ দূর্বল। ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটেন। বসে বসে ক্লাস নেন। শুনেছি - যাদুকরী কথাবার্তার কমতি ছিল না তখনো। স্যারের রুমে টেবিলে তখন বইয়ের পাশাপাশি ১৫/১৬ রকম অসুদ থাকতো। ক্লাস রুটিনের পাশাপাশি অসুদ খাবারও একটা রুটিন ছিল। আমি দেখা করতে গেলাম। আবার সেই আলোচনা। পশ্চিমা আগ্রাসন - গ্লোবালাইজেনশন থ্রেট...। মনেই হচ্ছিলো না - নিজের ভেতরে কী অসুখ নিয়ে তিনি কথা বলছেন!
বায়েজিদ স্যার জীবনের একটা গুরূত্বপূর্ণ সময় দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। ওয়েস্টার্ণ লাইফের জৌলুসের মোহ কাটিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। মীরপুরের পল্লবীর ছোটখাটো বাসায় থেকে তাঁর প্রিয় শহর ঢাকাকে ভালোবেসে কাছে থাকতে চেয়েছেন। অবসর সময়টুকু ছাত্রদের মাঝে কাটিয়ে টুকরো টুকরো ভাবনাগুলো শেয়ার করতে চেয়েছেন। মরণব্যাধি নিয়ে বারবার হসপিটালে ভর্তি হয়েও প্রচন্ড মানসিক শক্তির জোরে ফিরে এসেছেন ক্যাম্পাসে।
...ঈশ্বরের নিষ্ঠুর নিয়মকে এবার আর এড়াতে পারলেন না। জুলাই ২০০৬। স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমরা রয়ে গেলাম অসাধারণ এক মানুষের অপূরণীয় ঋণ ও ভালোবাসা নিয়ে!


ঃঃঃ আজ ৫ অক্টোবর। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ড. বায়েজিদ স্যারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP