18 December, 2006

খুন হয়ে যাই

তখনো সূর্য দেখা যায়নি। শীতের কুয়াশা আর শিরশির বাতাসে আমি অপেক্ষা করছি বাসের জন্য। আমাদের ছোটখাটো উপজেলা সদরটা পালটে গেছে অনেক। অন্ততঃ বছর দশেক তো হবেই; পরিচিত দোকান গুলোয় যাওয়া হয় না, আড্ডা দেয়া হয় না। মেরিনা কুলিং কর্ণার আর ক্যাফে ডিলাক্স বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। আজমীর হোটেল কিংবা শরীফ হোটেল আছে কিনা জানি না। এক টাকায় বড় বড় সিঙাড়া, দুই টাকার ডালপুরি কেটে দুই ভাগ করে দুই বন্ধু খাওয়া। আহ! পুরনো দিন গুলোর ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসছিল বারবার। হঠাত দেখি - অ্যাশ কালারের চাদর গায়ে দিয়ে আস্তে আস্তে হেটে আসছেন একজন। আমাদের প্রফুল্ল স্যার। ক্লাস ফাইভে অংক পড়াতেন। ভীষণ ভয় পেতাম। "দুইটি সংখ্যার যোগফল থেকে তাদের বিয়োগফল বাদ দিলে ফলাফল হবে ছোট সংখ্যার দি্বগুণ" - এইটা ক্যামনে হবে কিভাবে হবে ব্যাখ্যা করার জন্য সারাদিন সময় দিয়েছিলেন। বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোচিং ক্লাসে কলম মুখে দিয়ে আমরা সারাদিন বসেছিলাম।
...প্রফুল্ল স্যারকে দেখে এগিয়ে গেলাম। পায়ে ধরে সালাম করলাম। সহজ সরল এই মানুষটি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। নানান কথা হলো। কিন্তু আমি আর কথা এগুতে পারছিলাম না। ক্রমশঃ নিজের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। অল্প সময়ের জন্য দেশে গেলেও ঘটনাটা শুনেছি -
...গতমাসে কারা জানি (আসলেই?) কোন এক কারণে (আসলেই?) মাঝরাতে স্যারের ঘরের দরজায় লাত্থি মারে। এত রাতে কে এসেছে জানতে চেয়ে দরজা খুলতে দেরী হওয়ায় তারা নাকি ঘরের বেড়া কাটা শুরু করেছিল। শেষমেশ দরজা খুলতে হয়েছিল।
"আমি শিক্ষক মানুষ, আমার কাছে কি পাবা বাবারা..."
কথা শোনার সময় হয়তো ছিলো না। যার জন্য ’বাবা’রা এসেছিল, সে তখন সীমান্তের ওপারে। ঈশ্বর মানুষটা অতো খারাপ না। ঘরে কিছুনা পেয়ে মোবাইলটা নিয়ে গেছে। সিমকার্ড রেখে গেছে দয়াপরবশ হয়ে। আল্লাহ অবশ্যই বিপদশঙ্কুলদের হেফাজত করেন।
আমি প্রফুল্ল স্যারের চোখে তাকাতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না। এক সময়কার ভয় এখন ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। বাস ছাড়ার পর কেমন যেন তুচ্ছ মনে হচ্ছিল নিজেকে। ক্লাস এইটে ফেল করে পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়া আমাদের বন্ধু; এখনকার মুদি দোকানী সেলিমকে খুব হিংসে হয়। এই আগুন বাজারে সে হয়তো স্যারের কাছে খানিকটা কম দামে জিনিস বেচে। ফার্মেসীর দোকানদার ইকবাল হয়তো স্যারকে ডাকে - স্যার, আসেন প্রেশারটা একটু চেক করে দিই। ...আর আমি? আমি কি করছি?
আমি এখনো দৌড়াচ্ছি। মেরিনা কুলিং কর্ণারের তিন টাকার ড্যানিশ/প্যাটিসের বদলে আমি এখন ম্যাকমামা আর কেএফসি দাদুর ভক্ত। সিজলার্স, এমকে, ফুজি শেষ করে সেনানিগামসের ফোর হানড্রেড গ্রামের বীফ স্টেকে কামড় দিই আয়েশ করে। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার একটা ’ধান্ধা’ করছি অনেকদিন ধরে। হবে হবে করেও হচ্ছে না। কারেন্সী রেট ভায়োলেট করে অফিসে কিভাবে নতুন প্রজেক্ট পাস করানো যাবে ঐ চিন্তাটা মাথায় ঘুরে সারাদিন। আহারে প্রফুল্ল স্যার - আপনিই আমাকে যত্ন করে অংক শিখিয়েছিলেন। আপনার আশীর্বাদ আমার পাথেয়...।



ষোলইডিসেম্বরঃ
এবারের ষোল তারিখ সারাদিন আমি একজন বাবুরাম সাপুড়ের সাথে ছিলাম। ভীষণ ক্ষমতার এই মানুষটি আমার দেশেরই নাগরিক। বিদেশে এসেও তার হম্বিতম্ভির কমতি নেই। সারাদিন তার সাথে আমাকে থাকতে হয়েছে। বিনীত হয়ে কথা বলতে হয়েছে। অনেক অযৌক্তিক কথায় রাইট রাইট বলে যেতে হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডটা অফিসিয়াল। আমার মেরুদন্ড সারাদিন বাঁকা হয়ে ছিল। টিকটিকি হয়ে যাচ্ছিলাম প্রতি মুহূর্তে। তবুও সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছিলাম, বাংলাদেশ কম্যুনিটির প্রোগ্রামে যাবো...।
পাতায়ায় বাঙালী কম্যুনিটি খুব বড় নয়। ১৬০/১৭০ জনের মতো বাঙালী। আগের সন্ধ্যায় আফজাল ভাইয়ের দোকানে শুনেছি বেশ ভালো প্রোগ্রাম হবে। বিকেলে রেডি হলাম প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য। এবার যখন দেশে গেলাম তখন একজন ব্লগারের সাথে প্রথম দেখা হলো। প্রথম দিনই তিঁনি আমাকে চমতকার একটি টি-শার্ট গিফট করেছেন। শার্টের বুকে বিভিন্ন বাংলা বর্ণ। নিচে লেখা - "এক একটি বাংলা অক্ষর একেকটি জীবন"। খুব আগ্রহ করে টি-শার্টটি পরলাম। তখনই ফোন পেলাম - গ্রুপিং হওয়ায় বাংলাদেশ কম্যুনিটির প্রোগ্রাম হচ্ছে না, একটা গ্রুপ ব্যাংককে চলে যাচ্ছে। প্রোগ্রাম হবে কিনা অনিশ্চিত। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো।
এটিএন বাংলায় বিজয়ের গান চলছে - ’জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো...’
মা!

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP