24 February, 2007

স্বপ্ন ফুরোবার আগে

তারপর অনেকগুলো মুহূর্ত কেটে যায়। আমরা কথা বলি না। টেলিফোনের দুপাশে কেবল নি:শ্বাসের শব্দ, অক্ষমতার কষ্ট। বুঝতে পারি - এক নৈ:শব্দের মাঝে ডুব দিচ্ছি আমরা। আর কথা হয় না। মাধবী ফোনের লাইন কেটে দেয়। "রাজনীতি আমাদের জিম্মি করে দিলো" - মাধবীর কথাগুলো আমার চৈতন্যে শীষ দিয়ে যায়, ভাবনার গভীরে ভাবনা সৃষ্টি করে।

অস্থির সময়ের সহযাত্রী আমরা। ভাঙনের শব্দ আমাদের অনিশ্চিত গন্তব্যে নিয়ে যায়। আমরা জানিনা কোথায় যাবো, কীভাবে যাবো। নষ্ট সময়ের স্রোত আমাদের বিশ্বাসের নৌকায় বৈরী হাওয়া দেয়। চারপাশে সব কিছু ভেঙে পড়ছে প্রতিনিয়ত। গার্মেন্টসে আগুন লেগে শতশত শ্রমিক মারা যায়, তাদের লাশ গায়েব হয়ে যায়। অসহায় স্বজন ছবি হাতে অপেক্ষা করে আর বিত্তশালী শোষকগোষ্ঠী চুরি ঠেকাতে মেইন গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়। আগুনে বন্দী শ্রমিকের চিৎকারে মে দিবসের গান ম্লান হয়ে যায়। আরো একটি ভবন ধ্বসে পড়ে। আরো কিছু প্রাণ ঝরে যায়। কোথায় যেন একটা গড়বড় ছিল, কিংবা উল্টোপাল্টা কিছু হয়ে যাচ্ছে এখন। ক্ষমা করো - শফিক, বরকত, জব্বার; ভাষার জন্য রক্ত দেয়া এ জাতি এখন বিদূ্যৎ-পানির দাবীতে লাশ হয়ে ঘরে ফিরে। একাত্তরের তিরিশ লক্ষ প্রাণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সাহসটুকু নেই; অস্থির সময়ে সবাই এখন 'বন্ধু বাড়াতে' ব্যস্ত। তাই তো লাল-সবুজের পতাকা শোভিত গাড়ীতে সামরিক প্রহরায় ছড়ি ঘোরায় একাত্তরের কীট! নূরাণী চেহারায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে - "দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এখন এসব ইস্যু না"। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর, নিজেদের খুব ক্ষুদ্র মনে হয়, যখন ৩৫ বছর পর দেশে ফেরার পর আপনাকে সম্মান জানাতে পারলাম না! 'বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর' নির্বাচিত কীটগুলো আপনার কবরের পাশে দাড়িয়ে কী বললো - তা শুনেছেন নিশ্চয়! সকালের বাতাসের গুমোট ঝাপটায় আপনার দীর্ঘশ্বাস আমাদের ভেঙে দিয়ে যায়। তখন নিয়মের হর্তাকর্তারা রাজনীতির সাপ-লুড়ু খেলায় বারবার মই বেয়ে উপরে উঠে যায়। শহরের কম্যুনিটি সেন্টারগুলো ফোর-ডাইমেনশনাল আলোয় ঝলমল করে। বিরিয়ানী-কোর্মা-রোস্টেড ডাক শেষ করে শরাব জিসনে বানায়া উসে হামারা সালামে মাতোয়ারা হয় এলিট সোসাইটি। শ্রমজীবি-মেহনতি মানুষের রাতের ঘুমের বিঘ্ন ঘটিয়ে মার্সিডিজ-ফিয়াট-ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা সাঁইসাঁই করে শহর কাঁপিয়ে যায়। ট্রাফিকের লাল-সবুজ বাতি ঝিমুনির মতো জ্বলে আর নিভে। - - - আর দূর গ্রামে হারিকেনের টিমটিম আলোয় একদল কিশোর-কিশোরী 'আমার জীবনের লক্ষ্য' রচনা পড়তে গিয়ে দেশপ্রেমের তীব্র আলোয় উদ্ভাসিত হয়। আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। এ দেশকে গড়ে তোলা আমাদের সকলের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ দেশকে গড়ে তোলা আমাদের সকলের পবিত্র - - -। সামনে তাদের এসএসসি পরীক্ষা। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর ঝমঝম করে চলে যাওয়া রেলগাড়ী তাদের আগামীর উজ্জ্বল সকালের স্বপ্ন দেখায়। ঘরের চৌকাঠে বসে হতাশ চেহারায় তাদের বাবা অনিশ্চয়তার জালে ঘুরপাক খায়। বাজারে সার নেই, ডিজেল সাপ্লাই নেই। বোরো আমনের হিসাব মিলে না। আপাতত নিয়তির উপর সব দোষ চাপিয়ে হারিকেনের আধো আলো আধো ছায়ার মাঝে প্রত্যয়ী মুখগুলোর উপর আস্থা রাখতে ভালো লাগে তার। দেশের মাইক্রো আর ম্যাক্রো ইকনোমির হিসাব-নিকাশে তার কী-ই বা এসে যায়! পাঁচ তারার আলোকিত সেমিনার রূমে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে লুটেরা পলিসি মেকাররা কটকটে মিথ্যা বলে যায় - এবার জিডিপির গ্রোথ সেভেন পার্সেন্ট। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে, দারিদ্র্যসীমা কমছে। আরো বিদেশী বিনিয়োগ আসছে, মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে আর দেরী নেই। প্রয়োজন কেবল সবার সহায়তা! তারপর মিডিয়া মোঘলদের রঙীন কাগজে আর চ্যানেলে দারিদ্র্যের বাহারী মসলায় রান্না হয় উন্নয়নের স্যুপ। কিছু সেলিব্রেটি এসেও যোগ দেয় ওখানে। দু:খ কেবল - প্রমাণ করা গেলো না - বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি! থার্টি ফার্স্ট আর ভ্যালেন্টাইন ডে সাফল্যের পর এবার হ্যালুইন ডে প্র্যাকটিস করতে হবে। পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূল শংকায় উদ্বেল হলে কী-ই বা এসে যায়!

মোবাইলের মেসেজ টোন এলার্টে সম্বিৎ ফিরে পাই - "খেলা দেখো, আশরাফুল ভালো খেলছে"। টিভি খুলে বুকটা গর্বে ভরে যায়। বাংলার বিষ্ময় বালক ছক্কা মারলো মুরালীর বলে! উচ্ছ্বল গ্যালারী আনন্দে নেচে চলেছে। এবার আমি নিশ্চিত হই- এখনো সব তারা নিভে যায়নি। দূর গ্রামের কিশোর দলের প্রত্যয় ব্যর্থ হবে না, কারণ তারা শহরের সোডিয়াম আলোয় বিভ্রান্ত হয়নি। তারা আগামীর আলোকরশ্মি। আমার বাসার বারান্দার পাতাবাহার গাছে তখন কিছু ঘাসফড়িং উড়ে বসে। আমি মাধবীকে আবার ফোন করি। এবার সেও আশাবাদী। আমরা আবার নতুন করে খুঁজে পাওয়া আলোকরশ্মি - নক্ষত্র আর ঘাসফড়িংয়ের গল্প বলে যাই।

0 মন্তব্য::

  © Blogger templates The Professional Template by Ourblogtemplates.com 2008

Back to TOP